আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক মঞ্চে একদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে উত্তেজনা তুঙ্গে, অন্যদিকে ইসলামাবাদ সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে—
“পাকিস্তান কখনোই ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেবে না।”
শুক্রবার সৌদি আরবে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা শিল্পমন্ত্রী মোহাম্মদ রাজা হায়াত একরাশ কঠোর ভাষায় এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
পাকিস্তান সরকারের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়—ইসরায়েল উপমহাদেশে অস্থিতিশীলতার ইন্ধন জোগাচ্ছে এবং ফিলিস্তিন ও কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তান কোনোভাবেই পশ্চিমা চাপের কাছে মাথা নত করবে না। রাজা হায়াত বলেন, “পাকিস্তানের জনগণ, সরকার এবং সশস্ত্র বাহিনী কাশ্মীরের জনগণের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। যারা ইসরায়েলের সঙ্গে আঁতাত করে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, তাদের মোকাবেলায় আমরা প্রস্তুত।”
এই বার্তা এমন এক সময় এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফের আলোচনায় আনছেন মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা। এতে স্পষ্ট হচ্ছে, ‘আবরাহাম চুক্তি’ বা যুক্তরাষ্ট্রপন্থী কৌশলের প্রতি পাকিস্তান পুরোপুরি প্রতিরোধী অবস্থানে আছে।
অন্যদিকে, হেগের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানার মুখে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার নির্ধারিত ভ্যাটিকান সফর বাতিল করেছেন। ইসরায়েলি সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথ জানায়, নতুন পোপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় নেতানিয়াহু শেষমেশ ভ্যাটিকান সফর বাতিল করেন।
উল্লেখ্য, নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও দুর্ভিক্ষকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগে আইসিসি সরাসরি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। একই অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন তার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইউভ গ্যালান্টও। এর ফলে ইসরায়েলি শীর্ষ নেতৃত্বের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যতের কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশে বড় ধরনের অভিঘাত ফেলতে পারে।
ইউরোপও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। কাউন্সিল অফ ইউরোপের সভাপতি আন্তোনিও কস্তা গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘মানবিক ট্র্যাজেডি’ বলে অভিহিত করে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তার ভাষায়, “গাজায় আন্তর্জাতিক আইন পরিকল্পিতভাবে লঙ্ঘন করা হচ্ছে এবং এই অবরোধ একটি জাতিগত নিপীড়নের রূপ নিচ্ছে।” ইউরোপের সাতটি দেশের এক যৌথ বিবৃতিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—“গাজা উপত্যকার ওপর থেকে অবরোধ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। নীরব থাকা আর সম্ভব নয়।”
এদিকে চীনও সরাসরি অবস্থান জানিয়েছে ইরান প্রসঙ্গে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সাংবাদিকদের বলেন,
“চীন সবসময় ইরানের পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে রয়েছে এবং অবৈধ একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করে।”
তিনি আরও জানান, চীন কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমাধানের মাধ্যমে ইরানের পরমাণু ইস্যু মেটাতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, এবং তেহরানের অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতিকে গুরুত্ব সহকারে নিচ্ছে।
এই বক্তব্যগুলো একত্রে তুলে ধরছে একটি পরিস্কার বিভাজন—একদিকে পশ্চিমা সামরিক কৌশল ও ইসরায়েলপন্থী রাজনীতি, অন্যদিকে এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বে মার্কিন প্রভাব প্রতিহত করতে চাওয়া শক্তিগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান আরও সংহত হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই পরিস্থিতি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকেই উত্তপ্ত করছে না, এর প্রতিক্রিয়া পড়ছে দক্ষিণ এশিয়াতেও। পাকিস্তান যেখানে সরাসরি ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়েছে, ভারত সেখানে একাধিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা সমঝোতায় ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ শরিক। এর ফলে উপমহাদেশে কৌশলগত বিভাজন আরও প্রকট হয়ে উঠছে।
ফিলিস্তিন প্রশ্ন, পরমাণু তৎপরতা, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির কূটনীতি—সবমিলিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এখন উত্তপ্ত, বিভক্ত এবং সংঘাতমুখী। প্রতিটি পক্ষই নিজ নিজ অবস্থান শক্ত করতে চাচ্ছে, এবং এই প্রতিকূলতায় যে কোনো মুহূর্তে নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা বিশেষজ্ঞরা উড়িয়ে দিচ্ছেন না।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?