কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে প্রয়াত এক বিএনপি নেতার অসচ্ছল পরিবারকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে উপহার দেওয়া সেলাই মেশিন ফেরত দেওয়ার ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপহার দেওয়ার ছবি ও খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মেশিনটি ফেরত দেন ওই নেতার স্ত্রী। তবে এ ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না, তা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের মধ্যে ভিন্নমত দেখা দিয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের উত্তর জামষাইট গ্রামে প্রয়াত বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলামের বাড়ি থেকে সেলাই মেশিনটি ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) বিকেলে সাইফুল ইসলামের স্ত্রী ঝুমা আক্তারের হাতে সেলাই মেশিনটি তুলে দেন স্থানীয় জামায়াত নেতারা। সাইফুল ইসলাম বনগ্রাম ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছিলেন। তার মৃত্যুর পর তিন মেয়েকে নিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েন স্ত্রী ঝুমা আক্তার। তাকে স্বাবলম্বী করতে সেলাই মেশিনটি উপহার দেওয়া হয়েছিল বলে জানান জামায়াত নেতারা।
তবে উপহার দেওয়ার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি বদলে যায়।
এক ভিডিও বার্তায় ঝুমা আক্তার বলেন, তিনি প্রথমে জানতেন, তার প্রয়াত স্বামীর এক বন্ধু ব্যক্তিগতভাবে সেলাই মেশিনটি দিয়েছেন। এটি জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না।
পরে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি প্রচারিত হলে মেশিনটি ফেরত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। একই সঙ্গে নিজেকে বিএনপি পরিবারের সদস্য হিসেবে পরিচয় দেন ঝুমা আক্তার।
এ বিষয়ে স্থানীয় ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি মাওলানা মো. ইদ্রিস আলী বলেন, বনগ্রাম ইউনিয়ন জামায়াতের উদ্যোগে পরিবারটিকে সেলাই মেশিনটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরিবারটি মনে করে, এতে তাদের পারিবারিক সম্মান ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
তিনি জানান, ঝুমা আক্তার নিজেই ফোন করে মেশিনটি ফিরিয়ে নিতে বলেন। পরে শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সেটি ফেরত আনা হয়। এ সময় বনগ্রাম ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন।
কটিয়াদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা মাহমুদুল হাসান বলেন, পরিবারটির আর্থিক অসচ্ছলতার কথা বিবেচনা করে মানবিক সহায়তা হিসেবে সেলাই মেশিনটি দেওয়া হয়েছিল। এর আগেও গোপনে পরিবারটিকে আর্থিক সহযোগিতা করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, মানবিক সহায়তার কারণে পরিবারটি কোনো রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক চাপের মুখে পড়ুক, তা তারা চান না।
অন্যদিকে, বনগ্রাম ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আনোয়ার হোসেনের দাবি, প্রয়াত সাইফুল ইসলামের বন্ধু হিসেবে মাওলানা ইদ্রিস আলী ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেলাই মেশিনটি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে এটিকে জামায়াতের সাংগঠনিক সহায়তা হিসেবে প্রচার করা হয়। এতে বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
তবে রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ অস্বীকার করে স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন বলেন, মেশিনটি ফেরত দেওয়ার পেছনে কোনো রাজনৈতিক চাপ ছিল না।
তার দাবি, প্রয়াত বিএনপি নেতার এক বন্ধু ব্যক্তিগতভাবে সেলাই মেশিনটি দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে জামায়াতের পক্ষ থেকে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করায় ঝুমা আক্তার ক্ষুব্ধ হন এবং সেটি ফেরত দেন।
সংসদ সদস্য আরও জানান, ওই পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে ইতোমধ্যে বাড়ি মেরামত, শৌচাগার নির্মাণ ও নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ঝুমা আক্তারের কর্মসংস্থানের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরির ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে।
এদিকে কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক মো. রমজান আলী জানান, সেলাই মেশিন ফেরত দেওয়ার ঘটনা সম্পর্কে তিনি অবগত নন।
তিনি বলেন, জামায়াত রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা ধর্ম-বর্ণ বিবেচনা না করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে। তবে বিএনপির কেউ চাপ দিয়ে মেশিনটি ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করে থাকলে, সেটি তাদের বিষয়।
এ ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা চললেও সেলাই মেশিন ফেরত দেওয়ার পেছনে রাজনৈতিক চাপ ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, স্বামীকে হারিয়ে তিন মেয়েকে নিয়ে আর্থিক সংকটে থাকা ঝুমা আক্তারের কর্মসংস্থানের বিষয়টিও নতুন করে সামনে এসেছে।