নূরুল আলম কামাল, নেত্রকোনা :
আফরোজা আক্তার লিজা। নেত্রকোনা সদরের প্রত্যন্ত পঁচাশিপাড়া গ্রামে এক রক্ষণশীল পরিবারে জন্ম তাঁর। বিয়ের পর পারিবারিক টানাপোড়েনে স্বামীর সংসারেও টিকতে পারেননি আফরোজা। ভেঙে যায় সংসার নামক স্বর্গ নীড়। এক সন্তানকে নিয়ে স্বামীর সংসার থেকে হন বিতাড়িত। রক্ষণশীল পরিবারে শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। এমন পরিস্তিতির পড়তে পড়তে বাঁধা ডিঙ্গিয়ে আজ সফল নারী উদ্যোক্তা আফরোজা। নিজেকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করেছেন, তাঁর হাতেখড়ি অর্ধশত অসচ্ছল নারীও পেয়েছেন আর্থিক সচ্ছলতা।

২০০৩ সালে এসএসসি পাশ করার পর অদম্য ইচ্ছা থাকার পরও পারিবারিক অনীহায় কলেজ জীবনে অধ্যয়ন করার সুযোগ হয়নি। কয়েক বছর বাবার পরিবারের দেখবাল করেন আফরোজা। এরপর ২০০৭ সালে পরিবারিকভাবে বিয়ে হয় তাঁর। শুরু হয় নতুন স্বপ্ন। স্বামীর পাশে থেকে আয় করার শক্তি সঞ্চালক হিসেবে অবদান রাখবেন। এরমধ্যে আফরোজার ঘর আলোকিত সন্তান জন্ম হয়। স্বপ্ন তখন আরও বিস্তৃত হতে শুরু করে। কিন্তু সেই স্বপ্ন বিষাদে পরিণত হয়। নেমে আসে তাঁর উপর স্বামীর অবহেলা ও পারিবারিক অবজ্ঞা। চেয়েছিলেন স্বামীর অবহেলা ও পারিবারিক নির্যাতনের বাঁধা পেরিয়ে সুখের সংসার গড়ে তোলার। লড়াইটা ৮ বছর করার পর পরাজিত হন আফরোজা। সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি ফিরে নেমে পড়েন জীবনের অসম যুদ্ধে। পঁচাশীপাড়া গ্রামের বাড়ি থেকে নেত্রকোনা শহরের মালনী পাটপট্রি এলাকার বাবার বাসায় উঠেন। শৈশবের রপ্ত থাকা সুঁই-সুতাকেই হাতে তুলে নেন। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে বাটিক, বিউটিফিকেশন, সেলাইসহ বিভিন্ন কাজে নেন প্রশিক্ষণ। এছাড়াও বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) থেকে উদ্যোক্তার প্রশিক্ষণ নেন। নিজেকে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলেন। উদ্যোক্তা হিসেবে বিসিকের নিবন্ধিত হন। পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে শুরু করেন কুশি-কাটা দিয়ে শিশুদের সহ বিভিন্ন বয়সী মেয়েদের জামা কাপড়। বিভিন্ন দোকানে পাইকারী মূল্যে বিক্রি করেন। খরচ বাদে কিছু আয় হতে থাকে। অদম্য নারী আফরোজা। আয়ের টাকা সঞ্চয় করে আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন বুনেন। ধীরে ধীরে সুঁই -সুতার কাজের পরিধি বাড়াতে থাকেন। কর্মসংস্থানহীন নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদেরকেও নিজের কাজে সম্পৃক্ত করতে থাকেন। প্রশিক্ষিত হয়ে তারা বাড়িতে থেকেই কাজ করে পন্য সরবারহ করেন আফরোজার কাছে। সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে লিজাও এগিয়ে যেতে থাকেন। তাঁর তৈরী পোশাকের চাহিদাও বাড়তে থাকে ভোক্তাদের কাছে। ব্যবসার পরিধি বাড়াতে তিনি যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নেন।

২০২৩ সালে শহরের নাগড়া শিববাড়ি এলাকায় নিজের পন্য নিয়ে “লিজা বুটিক হাউজ” নামের একটি সেলস সেন্টার যাত্রা শুরু করে। এরপর আফরোজার পন্য দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে আমেরিকা, কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। “লিজা বুটিকস হাউজ” পোশাক তৈরীতে বর্তমানে ৫০জনেরও বেশি নারী যুক্ত রয়েছেন। খরচ বাদে মাসে গড়ে প্রায় ৫০-৬০ হাজার টাকা আয় হয় আফরোজার। তাঁর স্বপ্ন, শহরের প্রাণকেন্দ্রে বড় পরিসরে একটি শোরুম ও কারখানা গড়ে তোলার। তার কাজে আরো অনেক নারীকে সম্পৃক্ত করার।
আফরোজা শুধুই আর্থিক সক্ষমতায় নয়, নিজেকে সামাজিক কাজেও সম্পৃক্ত করেছেন। বিশেষ করে তাঁর সাথে কাজ করা নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো, সন্তানদের শিক্ষাসহ নানা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিও করে চলেছেন। একইভাবে সরকারি দপ্তরের সাথে সমন্বয় করে কৃষি বিপণন ব্যবস্থা থেকে শুরু করে বাল্য বিয়ের কুফল, শিশুদের সুরক্ষাসহ সমাজের প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্যে কাজ করছেন।
লিজার বুটিকস হাউজের পন্য তৈরীতে যুক্ত নারী শহরের নাগড়া এলাকার কামরুন্নাহার বাবলী বলেন,“ আমার সংসারে অভাব-অনটন লাইগ্যাই আছিল। বছর দেড়েক আগে আফরোজা আপার সাথে দেখা অইছিল।
এর পর থেইক্যা আমার জীবনডা বদলে গেছে। তার সাথে কাজে যোগ দেয়। প্রশিক্ষণ নেই লিজা আপার কাছে। অহন সেখান থেইক্যা মাসে বেশ কিছু টাকা আয় হয়। সংসারে এই টাকা লাগাতে পারতাছি। ছেলে- মেয়ের লেখাপড়ার খরচ চালাইতে পারতাছি। ”
একই এলাকার আরেক নারী মিনা বেগম বলেন, “অভাবের সংসারে আমার দু:খের দিন ঘুচিয়েছে লিজা আপা। তার কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে লিজা বুটিকস হাউজের পন্য তৈরী করি। অহন আমার জীবন অনেকটাই সহজ অইয়া গেছেগা। মাসে মাসে এইহান থেইক্যা যে ট্যাহা পাই এই দিয়া পোলাপান নিয়া ভালাই আছি।”
ডলি দেবনাথ দুই সন্তান আর স্বামীর সংসারে তিনিও ছিলেন অসচ্ছল। তিনি বলেন, স্বামীর আয়ে সংসার চলছিল না। লিজা আপাই আমারে ডাইক্যা কইলো কাজ করতে।
সেলাইয়ের কাজও শিখাইছে। অহন তার হাউজেই কাম করি। ট্যাহা পাই । আয় আইতাছে। সংসারেও অহন আর আগের মতো টানাটানি নাই।আমার মতন লিজা আপার কাছে ৫০ জনেরও বেশি মহিলা কাজ করেন।
বাবলী, ডলি ও মিনার মতো নেত্রকোনা শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার চৈতি সরকার, শিল্পী রায়,রুণা সরকার, ডলি দেবনাথ, কাঞ্চন দে, তন্নী সাহা, শিউলী সাহাসহ অর্ধশতাধিক নারী লিজা বুটিকস হাউজে কাজ করে চলেছেন।
আফরোজা আক্তার লিজা বলেন, জীবনের শুরুতেই ধাক্কা লাগে আমার। সংসার জীবনে স্বামী মাদকাসক্ত ছিল। তার সাথে মানিয়ে চলার অনেক চেষ্টা করি। কিন্তু তা হয়ে উঠেনি। তখন আমি সিদ্ধান্ত নেই কিছু করার। ছোট বেলায় শেখা হাতের কাজ কুশি-কাটার সেলাই নিয়ে শুরু করি। সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে প্রশিক্ষণ নিই। কুশি-কাটার পন্য তৈরী করে বিক্রি করতে থাকি। অন্য নারীদের সাথে নিয়ে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে আমার কাজে যুক্ত করতে থাকি। তারাও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে থাকে। আমার পন্যও দিন দিন বিক্রি বাড়তে থাকে। অনলাইনেও বিক্রি হয়। এখন দেশের
বাইরেও আমার পন্য যেতে থাকে। মাত্র ৫হাজার টাকা নিয়ে যাত্রা শুরু করি। এখন লিজা বুটিকস হাউজ নামে সেলস সেন্টার ওপেন করি। এই সেলস সেন্টার থেকেই পন্য বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন মেলাতেও আমার পন্য নিয়ে অংশ নেই। আমার সাথে যুক্ত থাকা নারীরাও আর্থিকভাবে অনেকটা
স্বাচ্ছন্দ্যে চলছেন। এখন চেষ্টা করছি শহরে একটি বড় পরিসরে শোরুম দেয়ার। আমার কু্শিরা-কাটার পন্যের একটা ব্র্যান্ড করতে চাই। একটা বড় আকারে করাখানা করতে
চাই। সরকারের সহযোগীতা দরকার। স্বল্প ও সহজ পদ্ধতিতে ঋণ পেলে স্বপ্নের পথে এগিয়ে যেতে পারবো।
অন্য নারীদের বিষয়ে লিজা বলেন, নারীরা শুধু ঘরে বসে না থেকে স্বাবলম্বী হতে কোন কাজ যেন করেন। তাহলে সংসারে ভুমিকা রাখতে পারেন। নিজে যেন পরের বোঝা না হন। তাহলে জীবনের যে সৌন্দর্য্য আছে তা উপলব্ধি করতে পারবেন। দেশের অর্থনীতিতেও ভূমিকা রাখতে পারবেন।
জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফারজানা পারভীন বলেন, আফরোজা আক্তার লিজা স্বামীর সাথে বিচ্ছেদের পর যুব উন্নয়ন থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে সুই-সুতার পন্য তৈরী করে ব্যবসার মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে পথ চলতে শুরু করেন। অদম্য ইচ্ছা শক্তিতে আজ তিনি সফল। গড়ে তোলেছেন “লিজা বুটিকস হাউজ”। নিজে স্বাবলম্বী হয়েছেন। সেখানে অনেক নারী কাজ করে তারাও অর্থনৈতিক সচ্ছলতায় ফিরছেন। এছাড়াও তিনি নিজেকে সামাজিক উন্নয়নমুলক কর্মকান্ডেও জড়িত রেখেছেন। এতে করে সমাজে বিশেষ করে নারীরা সচেতন হচ্ছেন।