মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
দেশের অন্যতম আলু উৎপাদনকারী জেলা মুন্সীগঞ্জে নতুন মৌসুমে আলু চাষের প্রস্তুতি শুরু হলেও কৃষকদের মধ্যে আগের মতো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। দীর্ঘদিন ধরে জেলার প্রান্তিক কৃষকদের প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিত আলু চাষ এখন অনেকটা অভ্যাস ও নেশায় পরিণত হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ, সংরক্ষণ সমস্যা এবং বাজারে চাহিদার সীমাবদ্ধতার কারণে এবার বিকল্প ফসলের দিকে ঝুঁকছেন অনেক কৃষক।
চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। গত মৌসুমের সমান লক্ষ্যমাত্রা রাখা হলেও আলুবীজ ও সার সরবরাহ এবং বিক্রির ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিয়েছে জেলা প্রশাসন। সরকার নির্ধারিত দামের বাইরে এসব কৃষি উপকরণ বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকট তৈরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে জেলার ছয়টি উপজেলায় আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ সদরে ৯ হাজার ৫৮১ হেক্টর, টঙ্গিবাড়ীতে ৯ হাজার ৭০ হেক্টর, সিরাজদিখানে ৮ হাজার ৯৫৮ হেক্টর, লৌহজংয়ে ৩ হাজার ১০৯ হেক্টর, গজারিয়ায় ১ হাজার ৯৯৮ হেক্টর এবং শ্রীনগরে ১ হাজার ৯৪৪ হেক্টর জমিতে আলু চাষের পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলার অধিকাংশ কৃষক ভালো ফলনের আশায় ডায়মন্ড জাতের আলু চাষ করে থাকেন। কিন্তু এ জাতের আলুর বড় সীমাবদ্ধতা হলো, খাবার হিসেবে ব্যবহার ছাড়া অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরিতে এর ব্যবহার নেই বললেই চলে। ফলে বাজারে চাহিদা তুলনামূলক কম থাকে। পাশাপাশি প্রাকৃতিকভাবে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় না এ আলু। বাড়িতে রেখে দিলে পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে উৎপাদনের পর কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে কৃষককে লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
এমন পরিস্থিতিতে গত কয়েক বছরে সরিষা, কালিজিরা, গাজর ও ধনিয়া চাষ করে লাভবান হওয়ায় এবার এসব ফসলের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে কৃষকদের। বিশেষ করে উঁচু জমিতে আলুর পরিবর্তে বিকল্প ফসল চাষের পরিকল্পনা করছেন অনেকে।
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের কৃষক আজমির হোসেন বলেন, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে আলু আবাদের জন্য জমি প্রস্তুতের কাজ শুরু হবে। প্রতিবছর প্রায় পাঁচ একর জমিতে আলু চাষ করেন তিনি। তবে চলতি মৌসুমে উঁচু জমিতে আলুর পরিবর্তে শিম, টমেটো ও সরিষা চাষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মুন্সীগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, জেলার কৃষকেরা মূলত ডায়মন্ড জাতের আলু চাষ করেন। এ জাতের ফলন ভালো হলেও সংরক্ষণক্ষমতা ও স্থায়িত্ব তুলনামূলক কম। এর বিকল্প হিসেবে বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে সানসাইন ও শান্তানা জাতের আলুবীজ রয়েছে। দামেও এসব বীজ সাশ্রয়ী এবং মানের দিক থেকেও উন্নত। এসব জাতের আলু খাবার হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি চিপসসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য তৈরিতেও ব্যবহার করা যায়।
এদিকে আলুর মৌসুম সামনে রেখে বীজ ও সারের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করেছে জেলা প্রশাসন। সম্প্রতি মুন্সীগঞ্জ জেলার আলুবীজ ও সার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় জেলা প্রশাসক সৈয়দা নুরমহল আশরাফী বলেন, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার ও আলুবীজ বিক্রি কিংবা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের ডিলারশিপ বাতিলসহ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সভায় প্রতি বস্তা আলুবীজের সর্বোচ্চ বিক্রয়মূল্য ১৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়।
সব মিলিয়ে আলু উৎপাদনে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি কৃষকদের লাভজনক চাষাবাদ নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত জাতের আলুবীজের ব্যবহার, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নয়ন না হলে মুন্সীগঞ্জের কৃষকদের মধ্যে আলু চাষের আগ্রহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।