পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা শহরের প্রধান খালের সংস্কার কাজে চলছে ধীরগতি। প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফা বাড়ানো হলেও নির্ধারিত সময় পেরিয়ে এখনো শেষ হয়নি কাজ। তিন বছর ধরে খালের বিভিন্ন অংশ কেটে ও ভাঙাচোরা অবস্থায় ফেলে রাখায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন দুই পাড়ের বাসিন্দারা। দীর্ঘদিনের অবহেলায় খালটির বিভিন্ন অংশে জমেছে ময়লা-আবর্জনা, পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে। এরই মধ্যে প্রকল্পের ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হলেও দেড় কিলোমিটার খনন ও দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ এখনো বাকি। বাকি কাজ আগামী তিন মাসে শেষ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও দেখা দিয়েছে সংশয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ৬ কোটি ৩৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য ২০২৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ন্যাচারাল নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারায় দুই দফা প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। এরপরও কাজ সম্পন্ন করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রকল্পের ৭৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। এ পর্যন্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ৪ কোটি ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করেছে। তবে বাস্তবে খালের দেড় কিলোমিটার অংশ খনন এবং দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এর আগে খনন করা অংশেরও দুই পাশের মাটি ধসে এবং পলি জমে আবার ভরাট হয়ে গেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, খালের বিভিন্ন অংশে খননকাজ অসম্পূর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কোথাও দুই পাশের মাটি ভেঙে পড়েছে, আবার কোথাও ময়লা-আবর্জনা জমে পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণকাজ ঝুলে থাকায় খালের দুই পাড়ের বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
খালপাড়ের বাসিন্দা মো. কাজল মিয়া জানান, দীর্ঘদিন ধরে দুই পাড়ের মানুষ অনিশ্চয়তা ও ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন। কখনো এক ধরনের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, আবার কিছুদিন পর আগের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হচ্ছে। এতে খালের দুই পাড়ে ভাঙচুর ও নির্মাণকাজ নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
আনিজ সিকদার অভিযোগ করেন, খালের দুই পাশে কোথায় কতটুকু ভাঙা হবে এবং কোথায় কী ধরনের নির্মাণকাজ হবে, সে বিষয়ে শুরু থেকেই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকলে এত দীর্ঘ সময় ধরে তাঁদের ভোগান্তি পোহাতে হতো না। বছরের পর বছর ধরে খালের দুই পাড় ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকলেও কাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।
মো. ফিরোজ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একেকবার একেকজন এসে একেক রকম নির্দেশনা দেন। প্রথমে কিছু ভাঙতে বলেন, পরে আবার অন্য জায়গা ভাঙতে বলেন। সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয় না। বছরের পর বছর ধরে খালের দুই পাড় ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। নির্দিষ্ট করে দেওয়া হলে দুই পাড়ের মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারতেন। জনগণই যদি ভালো না থাকে, তাহলে উন্নয়ন দিয়ে কী হবে?”
এদিকে প্রকল্পের ধীরগতির বিষয়টি উপজেলা ও জেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় একাধিকবার আলোচনায় এসেছে। তবে এসব আলোচনা ও তাগিদ সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজে কাঙ্ক্ষিত গতি ফেরেনি। ফলে কবে নাগাদ প্রকল্পের কাজ শেষ হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তির আশঙ্কা, ইতোমধ্যে উত্তোলন করা অর্থের তুলনায় অবশিষ্ট কাজের পরিমাণ বেশি। নতুন করে দায়িত্ব পাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে সব কাজ সম্পন্ন করা কঠিন হতে পারে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দাপ্তরিক জটিলতার পাশাপাশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতির কারণেও প্রকল্পের কাজে বিলম্ব হচ্ছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার কাজের গতি বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ইমরান হাসান বলেন, “খালের দুই পাশ তো বারবার ভাঙার কথা নয়। কেন বারবার ভাঙছে, সেটি এখনই বলতে পারব না। কাজের যে অংশটুকু বাকি রয়েছে, তা সম্পন্ন করতে ঠিকাদারকে দুই থেকে তিন মাস সময় দিয়েছি। সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। অন্যথায় জরিমানা আরোপ করে কাজের চুক্তি বাতিল করে দেওয়া হবে।”
তবে প্রকল্পের মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাচারালের কর্ণধার বা কোনো প্রতিনিধিকে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির কোনো কর্মকর্তার মুঠোফোন নম্বর দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্পের সাবঠিকাদার গলাচিপা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের প্যাদা বাড়ির মো. নুরুল হক প্যাদার ছেলে মো. আল আমিন প্যাদার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বেশ কয়েক দিন ধরে চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি খুদে বার্তা পাঠিয়েও তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।