রাজশাহী প্রতিনিধি, এম এ আতিকুর রহমান
বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ, পানিসংকট মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে রাজশাহীতে উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সংলাপে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং খরা ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আটটি অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) সকাল ১০টায় রাজশাহী নগরীর তেরোখাদিয়ায় ভিক্টোরিয়া কনভেনশন হলে ইয়ুথ ইন রিসার্চ অ্যান্ড অ্যাকশন ফর সোশ্যাল চেঞ্জের (ইউরিচ) উদ্যোগে এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার।
প্রফেসর ড. মুরশিদা ফেরদৌস ও মো. আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে বক্তব্য দেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের আবহাওয়া ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সরকার আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা নিয়েছে। বিশেষ করে রাজশাহীর মতো বরেন্দ্র অঞ্চলে অধিক হারে গাছ লাগাতে হবে। বৃক্ষরোপণের মাধ্যমে খরা মৌসুমে প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখা সম্ভব হবে।”
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদা হাবিবা বলেন, “বরেন্দ্র অঞ্চল আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তবে ক্রমাগত ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এটি বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ ঝুঁকি মোকাবিলা করতে না পারলে আমরাই বিপদে পড়ব।”
তিনি আরও বলেন, উচ্চপর্যায়ে নেওয়া পরিকল্পনাগুলো যেন আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। মরুকরণ রোধে জোরালো দাবি তোলার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এটি মোকাবিলায় সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকা আমাদের অধিকার। বিপন্ন জীবন ও প্রকৃতিকে সুরক্ষা দেওয়া আমাদের সবার দায়িত্ব।”
তিনি বলেন, গাছপালা ও পানির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব চিহ্নিত করার পাশাপাশি নারী ও শিশুদের ওপর এর প্রভাব তুলে ধরতে হবে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করে সবুজ ও সুন্দর পৃথিবী গড়তে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের পরিচালক অধ্যাপক মো. গোলাম মোস্তফা।
প্যানেল আলোচনা ও গোলটেবিল বৈঠকে কৃষি, জেন্ডার, পানিসংকট, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, স্বাস্থ্য, জীবিকা ও অর্থনীতি, খরা এবং তীব্র তাপপ্রবাহ ও শৈত্যপ্রবাহ—এই আটটি বিষয়ে বিদ্যমান সমস্যা, সংশ্লিষ্ট দাবি ও সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন সুপারিশ তুলে ধরেন অংশগ্রহণকারীরা।
সংলাপের আগে প্যানেল আলোচনায় বরেন্দ্র অঞ্চলের পরিবেশ ও পানিসম্পদ রক্ষায় আটটি অঙ্গীকার গ্রহণ করা হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের সীমা নির্ধারণ ও জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন সেচব্যবস্থা নিশ্চিত করা, খাল-পুকুর উদ্ধার ও ভূপৃষ্ঠের পানির ব্যবহার বাড়ানো, স্বল্প পানিনির্ভর ফসলের চাষ এবং কৃষকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
এ ছাড়া তাপপ্রবাহ ও খরায় স্বাস্থ্য সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা, সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও স্থায়ী বাজেট নিশ্চিত করা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে তদারকি জোরদার করার অঙ্গীকার করা হয়।
অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে ইউরিচের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক মেহেদী হাসান হৃদয় বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির টেকসই ব্যবহার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করতে ‘বরেন্দ্র ঘোষণা ২০২৬’ বাস্তবায়ন জরুরি। এ লক্ষ্যে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, উন্নয়ন সহযোগী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন রাজশাহী-৫ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মন্ডল, নওগাঁ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফআইডিসি) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চের সহকারী পরিচালক মোসা. রউফা খানম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক কাজী রবিউল আলম, লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক পারভেজ আজহারুল হক এবং নৃবিজ্ঞান বিভাগের রাদিয়া আউয়াল তৃষাসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা।