মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি:
শীত আসতে এখনো সময় আছে। কিন্তু শীতকালীন সবজির চাষের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে মুন্সীগঞ্জে। মাঠে সবজির চাষ শুরুর আগেই জেলার বিভিন্ন বীজতলায় তৈরি হচ্ছে আগাম সবজির চারা। কৃষকেরা ব্যস্ত বীজ বোনা, চারা পরিচর্যা, পানি দেওয়া ও বিক্রির প্রস্তুতিতে।
এই চারার ওপর ভর করেই প্রতি মৌসুমে জমে ওঠে কোটি টাকার বাণিজ্য। বীজতলা প্রস্তুতকারী কৃষকদের হিসাবে, তিন থেকে চার মাসের মৌসুমে প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়। মুন্সীগঞ্জের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এসব চারা চলে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলার কৃষকদের কাছে।
সদর উপজেলার পঞ্চসার, বজ্রযোগিনী ও রামপাল এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট-বড় দেড় শতাধিক চারা উৎপাদনের প্রকল্প। এর সিংহভাগই পঞ্চসার এলাকায়। আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় চারা উৎপাদন। সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে শুরু হয় বিক্রির ধুম, যা তিন থেকে চার দফায় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে।
বীজতলায় ব্যস্ততার দৃশ্য
সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্যেরবাগ, কেপিবাগ ও সিকদার বাড়ি এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ বীজতলা বাঁশের চাটাই দিয়ে ঢাকা। চাটাইয়ের নিচে সারিবদ্ধ বীজতলায় বেড়ে উঠছে টমেটো, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ব্রকলি, লাউ, মিষ্টিকুমড়া ও মরিচের চারা।
কোনো বীজতলায় চাটাই সরিয়ে পানি দিচ্ছেন কৃষক। কোথাও চলছে আগাছা পরিষ্কার। আবার কেউ ব্যস্ত নতুন বীজতলা তৈরিতে।
চারাগুলোকে অতিরিক্ত রোদ ও বৃষ্টি থেকে রক্ষা করতে বাঁশের চাটাই ব্যবহার করা হয়। সকালে ও বিকেলে চাটাই সরিয়ে চারায় রোদ লাগানো হয়। আর দুপুর ও বৃষ্টির সময় বীজতলা ঢেকে রাখা হয়।
৫০ শতকে ৫০ বীজতলা
সিকদার বাড়ি এলাকার চারা চাষি আতিক হাসান বলেন, তাঁদের ৫০ শতক জমিতে প্রায় ৫০টি বীজতলা রয়েছে। এক মৌসুমে প্রতিটি বীজতলায় তিন দফায় চারা উৎপাদন করা হয়। প্রতিটি বীজতলার এক দফার চারা কমপক্ষে ৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
তাঁর হিসাবে, সব মিলিয়ে প্রতি মৌসুমে তাঁদের বীজতলা থেকে ৪০ থেকে ৪৫ লাখ টাকার চারা বিক্রি হয়।
আতিক হাসান বলেন, চারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত কৃষকেরা মোটামুটি একই ধরনের দামে চারা বিক্রি করেন। তবে ভালো জাতের ও মানসম্মত চারার চাহিদা বেশি থাকায় বিক্রিও ভালো হয়।
জেলার সীমানা ছাড়িয়েছে চাহিদা
মুন্সীগঞ্জের চারা এখন জেলার বাইরেও পরিচিত। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এসব চারা যাচ্ছে সাভার, মানিকগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা ও চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
চারা ব্যবসায়ী লিটন শিকদার বলেন, মুন্সীগঞ্জের বীজতলায় উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করা হয়। এক কেজি বীজের দাম এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। এসব বীজ থেকে উৎপাদিত চারা দিয়ে কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত ফলন পান। এ কারণেই বিভিন্ন জেলায় মুন্সীগঞ্জের চারার চাহিদা রয়েছে।
তবে প্রতিবছর লাভের পরিমাণ এক থাকে না। লিটন শিকদার বলেন, প্রতি মৌসুমে ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার চারা বিক্রি হয়। কোনো বছর খরচ বাদ দিয়ে ভালো লাভ হয়, আবার কোনো বছর লাভ কমে যায়। তারপরও বংশপরম্পরায় তাঁরা এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন।
স্বাধীনতার আগে শুরু
চারা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত অন্তত ১০ জন কৃষক ও কৃষিশ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্বাধীনতার আগে থেকেই মুন্সীগঞ্জে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন ও বিক্রি হয়ে আসছে।
তখন অল্প পরিমাণে চারা উৎপাদন করা হতো। জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও আশপাশের দু-একটি জেলায় এসব চারা বিক্রি করা হতো। প্রায় দুই যুগ ধরে ধীরে ধীরে এ ব্যবসার প্রসার ঘটে।
কৃষকেরা খৈল, জৈবসার ও পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করে উন্নত জাতের চারা উৎপাদন শুরু করেন। একপর্যায়ে মুন্সীগঞ্জের চারার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
চারার আয়েই চলে সংসার
কেপিবাগ এলাকার কৃষক স্বপন দেওয়ান বলেন, সবজি উৎপাদনের চেয়ে চারা উৎপাদন তাঁদের কাছে বেশি লাভজনক। প্রতিবছর তিন-চার মাস ব্যাপকভাবে শীতকালীন সবজির চারা উৎপাদন করেন তাঁরা। এই সময়ের আয় দিয়েই সারা বছর ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালানো সম্ভব হয়।
তবে এই আয়ের সঙ্গে ঝুঁকিও কম নয়। স্বপন দেওয়ান (৫০) বলেন, গত বছর বৃষ্টির কারণে তাঁদের চারার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। বৃষ্টির কারণে বিক্রিও কমে যায়। ফলে তেমন লাভ হয়নি।
তিনি বলেন, এবারও মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি হচ্ছে। কয়েক দিনের মধ্যে চারা বিক্রির ধুম শুরু হওয়ার কথা। বৃষ্টি বেশি হলে কৃষকেরা জমিতে সবজি আবাদে দেরি করবেন। তখন বিক্রির উপযোগী অনেক চারা ফেলে দেওয়া ছাড়া উপায় থাকবে না। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার ভালো লাভের আশা করছেন তিনি।
২৫-৩০ দিনেই শেষ করতে হয়
শ্রমিক বাবু দেওয়ান বলেন, চারা উৎপাদনের কাজ বেশ কঠিন। প্রতিটি ধাপ খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। অঙ্কুরিত হওয়ার ২৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে চারা বিক্রি করতে হয়।
তিনি বলেন, অতিরিক্ত রোদ ও বৃষ্টি চারা সহ্য করতে পারে না। তাই দুপুর ও বৃষ্টির সময় চাটাই দিয়ে বীজতলা ঢেকে রাখতে হয়। আবার সকালে ও বিকেলে রোদ দেওয়ার জন্য চাটাই সরিয়ে রাখা হয়। পানি দেওয়া ও আগাছা পরিষ্কারের সময়ও খুব সতর্ক থাকতে হয়।
বাড়ছে উৎপাদন খরচ
একই এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম (৮০) বলেন, এবার সার ও বীজের দাম আগের চেয়ে বেড়েছে। এখনো চারা বিক্রি শুরু হয়নি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ব্যাপক লোকসান গুনতে হবে। এ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে তাঁরা সরকারের সহযোগিতা চান।
কৃষকদের মতে, চারা উৎপাদনে সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা আবহাওয়া। বিশেষ করে মৌসুমের শুরুতে বৃষ্টি হলে একদিকে যেমন চারার ক্ষতি হয়, অন্যদিকে বিক্রিও কমে যায়।
বিঘায় আয় ১০ থেকে ১২ লাখ
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, সদর উপজেলায় চারা উৎপাদন কৃষকদের জন্য অন্যতম লাভজনক খাতে পরিণত হয়েছে।
পঞ্চসার, রামপাল ও বজ্রযোগিনী ইউনিয়নে ২৫ থেকে ৩০ জন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছেন। তাঁরা শুধু শীতকালেই নয়, সারা বছর উন্নত ও মানসম্মত চারা উৎপাদন করছেন। এসব চারার জন্য বিভিন্ন জেলায় প্রতিষ্ঠিত বাজার রয়েছে এবং চাহিদাও ব্যাপক।
তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমি থেকে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করছেন চারা চাষিরা। নিয়মিত চারা উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কৃষি বিভাগ সব সময় সহযোগিতা করছে।
ফলে শীতের সবজি মাঠে ওঠার আগেই মুন্সীগঞ্জের বীজতলাগুলোতে তৈরি হচ্ছে সেই সবজির ভবিষ্যৎ। কৃষকের জমিতে আগাম সবজি উৎপাদনের পেছনে এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে জেলার এই চারা উৎপাদনকেন্দ্রগুলো।