প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন দাবি করেছেন, নির্বাচিত বিএনপি সরকার গত সাত মাসে দেশের মানুষের জন্য অভূতপূর্ব বাকস্বাধীনতা ও নাগরিক মানবাধিকার নিশ্চিত করেছে। রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ আয়োজিত ‘গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও জবাবদিহিমূলক সরকার ব্যবস্থা’ শীর্ষক আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ পরবর্তী পুঞ্জীভূত জঞ্জাল একবারে রাতারাতি মূলোৎপাটন করা দুরূহ। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, এই সাত মাসে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কোথাও রাষ্ট্রীয় মদদে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেনি। কোথাও রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কোনো গুম হয়নি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেনি কিংবা নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর কোনো ঘটনা ঘটেনি। রাষ্ট্রীয় মদদে বিরোধী দলের ভিন্ন মত, পথ, ভিন্ন আদর্শ কিংবা রাজনৈতিক মূল্যবোধকে হরণ করা হয়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন,
‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসাবশত কোনো প্রকার মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আমাদের জানা মতে ঘটেনি।’ ‘রাষ্ট্রীয় মদদে’ শব্দবন্ধটি কেন বারবার স্পষ্ট করে বলছেন, তার ব্যাখ্যাও তিনি দেন। তার ভাষ্য, অতীতে একটি নির্দিষ্ট সরকারি কার্যালয় থেকে বা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিরোধী মতের মানুষের তালিকা করা হতো এবং নির্দেশ দিয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করা হতো। অর্থাৎ নিপীড়নের নকশা আঁকা হতো ক্ষমতার কেন্দ্রেই, আর মাঠপর্যায়ের বাহিনী ছিল কেবল সেই নকশা বাস্তবায়নের হাতিয়ার।
স্থানীয় পর্যায়ে বিচ্ছিন্নভাবে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা বা প্রশাসনিক ভুলভ্রান্তি ঘটে থাকলে তাৎক্ষণিকভাবে তা জবাবদিহিতার আওতায় আনা হচ্ছে জানিয়ে মাহ্দী আমিন বলেন, কোথাও কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে দ্রুততম সময়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং আইনের অনুশাসন নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এই গণতান্ত্রিক ধারাকে সরকার স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায়। তৃণমূলে কোথাও ত্রুটিবিচ্যুতি ঘটলে অতীতের মতো তা ধামাচাপা না দিয়ে তথ্য পাওয়ামাত্রই তদন্ত ও প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্র থেকে দমন-নিপীড়নের যে সংস্কৃতি বছরের পর বছর জেঁকে বসেছিল, তা ভেঙে এখন প্রান্তিক মানুষের অভিযোগকেও মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই ঐতিহাসিক আন্দোলন নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দল বা নির্দিষ্ট কোনো জনগোষ্ঠীর আন্দোলন ছিল না। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে পোশাক শ্রমিক, রিকশাচালক, প্রবাসী, নারী, শিক্ষক, আইনজীবী, চিকিৎসক ও সাংবাদিকসহ সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজ নিজ অবস্থান থেকে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছেন। তার ভাষায়, এমন একটি জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, যেখানে সবাই ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে এক বিন্দুতে মিলিত হয়েছিল।
আইন প্রণয়নে অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একশর বেশি অধ্যাদেশ বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনেই পূর্ণাঙ্গ আইনে রূপান্তর করা হয়েছে। এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক আইন সংসদীয় প্রক্রিয়ায় পাস করার নজির অতীতে বিরল। নতুন যেসব আইন হয়েছে সেগুলোর খসড়া অনেক আগেই উন্মুক্ত করা হয়েছিল এবং অংশীজনদের মতামত নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি মনে করিয়ে দেন, আইন প্রণয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। দীর্ঘ ১৭ বছরের দুঃশাসনের পর দায়িত্ব নেওয়া সংসদ সদস্যরা সর্বস্তরের মানুষের মতামত ধারণের চেষ্টা করছেন, ফলে প্রথমবারেই শতভাগ নিখুঁত পরিবর্তন সম্ভব নাও হতে পারে। তবে যেখানে বাস্তবসম্মত মনে হচ্ছে, সেখানে সরকার প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনছে।
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ নির্দেশনা রয়েছে, একটি আইনকে কীভাবে জনবান্ধব ও বাস্তবসম্মত করা যায় সেজন্য গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে সক্ষম সবার সঙ্গে নিবিড় পরামর্শ চালিয়ে যেতে হবে। তিনি বলেন, আইনের অক্ষরের চেয়ে সেই আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ফ্যাসিবাদের সময়ে সংবিধানের নানা ধারার অপব্যাখ্যা দিয়েই মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল, মানবাধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল। কাজেই আইনের ভাষার পাশাপাশি তার মানবিক ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক প্রতিফলন নিশ্চিত করা আরও বেশি জরুরি।
তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আদর্শ ও সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দেশে এখন সর্বোচ্চ বাকস্বাধীনতা বিরাজ করছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অশালীন বা অশ্রাব্য আচরণ করা হলেও সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ পরমসহিষ্ণুতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বজায় রাখা হচ্ছে। সংকীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা ও দর্শনের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই ছিল গণঅভ্যুত্থানের প্রধান লক্ষ্য। দেশের বৃহত্তর স্বার্থ, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাইকে এক ও অবিচল থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সামনে রেখে সাধারণ মানুষ, গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। ভিন্ন মত ও পথকে এক ছাদের নিচে এনে দেশের স্বার্থকে সবার ওপরে স্থান দেওয়াকেই তিনি প্রকৃত গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা বলে অভিহিত করেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি সংকটে এবং গণতান্ত্রিক পালাবদলে বিএনপির ভূমিকা অপরিসীম দাবি করে তিনি বলেন, বাকশাল, সামরিক শাসন কিংবা দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের পর প্রতিবারই বিএনপির হাত ধরে এ দেশে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাকশালের পর শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাধ্যমে সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তন ঘটে এবং দীর্ঘ ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দূরদর্শী নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ পুনরায় গণতান্ত্রিক কক্ষপথে ফিরে এসেছে।
তিনি বলেন, সরকার একটি প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সুষম জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কাজ করছে, যেখানে স্বাধীনতা, অখণ্ড সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। আজকের মুক্ত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ দীর্ঘ ফ্যাসিবাদবিরোধী রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল মন্তব্য করে তিনি জানান, ফ্যাসিবাদী আমলে কেবল বিএনপিরই ৬০ লক্ষাধিক নেতাকর্মী মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন, হাজার হাজার সহযোদ্ধা গুম ও শহীদ হয়েছেন। গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিটি রাজনৈতিক দলকেই এই কঠিন আত্মত্যাগের পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
রাষ্ট্র ক্ষমতার একমাত্র উৎস ও প্রকৃত মালিক এ দেশের জনগণ, এই বিশ্বাস থেকেই জনগণের প্রতি শতভাগ দায়বদ্ধতা ও পূর্ণ স্বচ্ছতা নিয়ে বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনায় অঙ্গীকারবদ্ধ বলে জানান তিনি। কেবল রাজনীতিকরা নন, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম, বেসরকারি খাত এবং বিশেষ করে তরুণ ও নারী সমাজকে মূল চালিকাশক্তি করেই দেশ এগিয়ে যাবে বলে তিনি মত দেন। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তের ঋণ শোধ করে বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে কাঙ্ক্ষিত মর্যাদার আসনে পৌঁছে দেওয়ার আশাবাদও ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনায় আরও অংশ নেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির, বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী এবং চিকিৎসক ও তরুণ রাজনীতিক তাসনিম জারা প্রমুখ। অনুষ্ঠানে শিক্ষাবিদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তরুণ শিক্ষার্থী এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের তরুণরা উপস্থিত ছিলেন।