বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষককে বরখাস্ত বা চাকরি থেকে অপসারণের মতো গুরুতর শাস্তি দিতে হলে শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র মাধ্যমে তা পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক। বোর্ডের অনুমোদন ছাড়া গভর্নিং বডি কোনো শিক্ষকের বরখাস্ত বা অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে পারে না বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
অসদাচরণের অভিযোগে এক কলেজ শিক্ষককে বরখাস্তের সিদ্ধান্তে শিক্ষা বোর্ডের অনাপত্তিকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারি করা রুল খারিজ করে এ রায় দেন আদালত।
রায়ে হাইকোর্ট বলেন, বেসরকারি কলেজের শিক্ষককে বরখাস্ত বা অপসারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রবিধানমালা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের নীতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। কোনো শিক্ষককে যথাযথভাবে কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়ে কিংবা শুধু মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠন করে দ্রুত বরখাস্ত করা আইনগত কর্তৃত্বের বাইরে এবং সম্পূর্ণ বেআইনি।
‘মোহা. আখতারুজ্জামান বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য’ মামলায় আদালত এসব পর্যবেক্ষণ দেন।
গত ৭ জুলাই বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ও বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবিরের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি সোমবার (৩১ আগস্ট) প্রকাশিত হয়েছে। মামলার মূল রায়টি লিখেছেন বিচারপতি দিহিদার মাসুম কবির।
মামলায় রিটকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মো. কামরুজ্জামান। কলেজ শিক্ষকের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. জহিরুল ইসলাম। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আনিসুর রহমান খান ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সুলতান মাহমুদ বান্না।
যে সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন হাইকোর্ট
রায়ে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার গচিহাটা কলেজের গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত বাতিল করে তাকে বকেয়া বেতন-ভাতা ও অবসরকালীন সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের ‘আপিল ও সালিশ কমিটি’র সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর গচিহাটা পল্লী একাডেমির প্রধান শিক্ষিকা জাকিয়া বেগম ওই কলেজ শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ওইদিন সকালে আবুল মনসুর জাকিয়া বেগমের বাড়িতে যান। প্রথমে তাঁর মেয়েকে একটি বই ফেরত দেওয়ার কথা বলে সেখানে গেলেও পরে অসৎ উদ্দেশ্যে আবার বাড়িতে ফিরে এসে তাঁর ছোট মেয়ের পাশে বসেন এবং মাথা ও হাতে স্পর্শ করেন। তিনি তৃতীয়বারও বাড়িতে প্রবেশের চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ নভেম্বর কলেজের অধ্যক্ষ শিক্ষক আবুল মনসুরকে শোকজ নোটিশ দেন। নোটিশে অভিযোগের তারিখ হিসেবে ৭ নভেম্বর উল্লেখ করা হয় এবং তিন দিনের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়। পরদিন দেওয়া জবাবে শিক্ষক বাড়িতে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করলেও অসৎ উদ্দেশ্য বা অনৈতিক আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় গভর্নিং বডি ২৯ নভেম্বর পাঁচটি নির্দিষ্ট প্রশ্নসংবলিত দ্বিতীয় শোকজ নোটিশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ৬ ডিসেম্বর দেওয়া জবাবেও শিক্ষক তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এরপর গভর্নিং বডির সভাপতি ও কলেজের প্রতিষ্ঠাতা মোহা. আখতারুজ্জামানের মৌখিক বা মোবাইল ফোনের নির্দেশে ৭ ডিসেম্বর অধ্যক্ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। কমিটি মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ২০১৫ সালের ৩১ জানুয়ারি গভর্নিং বডির সভায় শিক্ষক আবুল মনসুরকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ১ ফেব্রুয়ারি থেকে তা কার্যকর দেখানো হয়।
বোর্ডের সিদ্ধান্ত
বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদনের জন্য ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি তা ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের আপিল ও সালিশ কমিটিতে পাঠানো হয়। একই বছরের ২০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত সভায় কমিটি গভর্নিং বডির বরখাস্তের প্রস্তাব নামঞ্জুর করে শিক্ষককে সব বকেয়া বেতন-ভাতাসহ পদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেয়।
২৮ মে মেমোর মাধ্যমে কলেজ কর্তৃপক্ষকে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। পরে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করা হলেও শিক্ষা বোর্ড জানায়, আপিল ও সালিশ কমিটির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কোনো আইনগত বিধান নেই।
এরপর বোর্ডের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নিং বডির সভাপতি মোহা. আখতারুজ্জামান। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে আদালত রুল জারির পাশাপাশি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ দেন।
চূড়ান্ত শুনানি শেষে চলতি বছরের ৭ জুলাই হাইকোর্ট রুল খারিজ করে আগের স্থগিতাদেশও বাতিল করেন।
বকেয়া পাওনা দেওয়ার নির্দেশ
হাইকোর্ট রায়ে উল্লেখ করেন, মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় শিক্ষক আবুল মনসুর অবসর গ্রহণের নির্ধারিত বয়সে পৌঁছে গেছেন। ফলে তাকে বর্তমানে আগের পদে পুনর্বহালের সুযোগ নেই।
তবে বরখাস্তের তারিখ থেকে অবসরে যাওয়ার তারিখ পর্যন্ত তাঁর প্রাপ্য সব বকেয়া বেতন-ভাতা, চাকরিসংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা এবং প্রযোজ্য পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
আদালত বলেন, আপিল ও সালিশ কমিটির পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিক্ষা বোর্ডের চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো শিক্ষককে সরাসরি বরখাস্ত বা অপসারণের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা যায় না। গচিহাটা কলেজ কর্তৃপক্ষ বোর্ডের অনুমোদনের আগেই বরখাস্তের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে বোর্ডের আইনগত এখতিয়ার অগ্রাহ্য করেছে, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
রায়ে শিক্ষা বোর্ড ও কলেজ কর্তৃপক্ষকে আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের পাওনা সুবিধা দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।