সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে অভিযোগ করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির পরিবর্তে সরকারের কর্মকাণ্ডে দলীয় স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট, প্রশাসনে দলীয় নিয়োগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতার কারণে সরকারের গতি ও অগ্রগতি হতাশাজনক।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাজধানীর বিজয়নগরে এবি পার্টির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত ‘সরকারের ছয় মাস: প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা—জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ খতিয়ান’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন দলের নেতারা।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ।
মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, একটি নির্বাচিত সরকারের কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য ছয় মাসকে একেবারে কম সময় বলা যায় না। ইতোমধ্যে সরকারের মেয়াদের প্রায় এক-দশমাংশ সময় পার হয়েছে। তবে শুধু ছয় মাসের ভিত্তিতে সরকারের পূর্ণাঙ্গ সাফল্য বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত মূল্যায়নও ঠিক হবে না। অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, দ্রব্যমূল্য, প্রশাসন, উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও গণতান্ত্রিক চর্চাসহ বিভিন্ন সূচকে সরকারের কার্যক্রম বিচার করতে হবে।
তিনি বলেন, এসব সূচক বিবেচনায় গত ছয় মাসে প্রত্যাশিত উন্নতি দেখা যায়নি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের তুলনায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
এবি পার্টির চেয়ারম্যানের দাবি, মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে জীবনমানের উন্নতি হয়নি। বরং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়েছে এবং নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালুর ক্ষেত্রেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কথা বললেও বাস্তবে বেকারত্ব কমেনি। সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে স্থবিরতা রয়েছে। জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে আলোচনার পরামর্শ দেওয়া হলেও সরকার তা গ্রহণ করেনি। ভবিষ্যতে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট আরও তীব্র হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রশাসনে নিয়োগের বিষয়েও সরকারের সমালোচনা করেন মঞ্জু। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন পদে দলীয় লোক নিয়োগ এবং ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক সহিংসতা সরকারের সুশাসনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
প্রধানমন্ত্রীর মিতব্যয়িতা ও সাদামাটা জীবনযাপনের বার্তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত আচরণ ও কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে মিতব্যয়িতা, সময়ানুবর্তিতা ও জৌলুস পরিহারের বার্তা দিচ্ছেন। কিন্তু দলের নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড এবং ধর্মীয় ব্যক্তিদের ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে মঞ্জু বলেন, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সামাজিক অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টা হলেও এখন পর্যন্ত এর দৃশ্যমান প্রভাব পাওয়া যাচ্ছে না। বরং এসব কর্মসূচি ঘিরে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে।
তিনি বলেন, সরকারের বর্তমান কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলে বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রয়োজন নাও হতে পারে। জনদুর্ভোগ বাড়তে থাকলে সাধারণ মানুষই একসময় প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার সংস্কৃতি আবারও ফিরে আসছে, যা কাম্য নয়। তবে এখন পর্যন্ত রাজনৈতিক সহনশীলতার যে পরিবেশ রয়েছে, সেটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে এবি পার্টি। সরকারের পুরো মেয়াদে এই সহনশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানান তিনি।
ভারত সফর নিয়ে সরকারের অবস্থানকে ইতিবাচক উল্লেখ করে ফুয়াদ বলেন, বিএনপির ৩১ দফার বেশ কয়েকটি বিষয় ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হয়নি। তাঁর দাবি, ৩১ দফার অন্তত ৮ থেকে ১০টি দফা অমান্য করা হয়েছে।
দলীয় নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যোগ্য ব্যক্তিদের নীতিমালা অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়া হলে আপত্তির কিছু নেই। তবে ক্রীড়াঙ্গনকে দলীয়করণ না করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হয়নি। বিচার বিভাগ ও দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠনসহ বিভিন্ন প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। নির্বাচন কমিশনেও দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন ফুয়াদ।
তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাসের মধ্যেই বিএনপি তাদের ৩১ দফার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে গেছে।
গুম ও মানবাধিকার প্রসঙ্গে ফুয়াদ অভিযোগ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা সংশ্লিষ্ট অধ্যাদেশ বাতিল করে এমন আইন করা হয়েছে, যা আগের আইনের চেয়েও দুর্বল। গুমের সঙ্গে জড়িতদেরই তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
জ্বালানি খাত বেসরকারীকরণের প্রসঙ্গে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক বলেন, সংসদে নীতিমালা প্রণয়ন ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ছাড়া জ্বালানি খাত বেসরকারি খাতে দেওয়া উচিত নয়। এবি পার্টি বেসরকারীকরণের বিরোধী নয়, তবে পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
দেশের জঙ্গিবাদ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করারও পরামর্শ দেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।