মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
স্বপ্ন ছিল নিজের জন্য নয়—বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর। স্বপ্ন ছিল অভাবের সংসারে একটু স্বস্তি আনার। টিনের একটি ভালো ঘর বানিয়ে বাবা-মাকে সুখে রাখবেন, স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে নিয়ে সাজাবেন সুন্দর একটি ভবিষ্যৎ।
সেই স্বপ্ন বুকে নিয়েই প্রিয়জনদের ছেড়ে জীবিকার সন্ধানে পাড়ি জমিয়েছিলেন দুবাইয়ে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই প্রবাসের মাটিতে থেমে গেল মো. ফয়সাল বেপারীর জীবন।
মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বাংলাবাজার ইউনিয়নের চর বানিয়াল এলাকার আলী আহম্মদের ছেলে ফয়সাল বেপারী দুবাইয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে স্ট্রোক করে ইন্তেকাল করেছেন বলে পরিবার সূত্রে জানা গেছে।
ফয়সালের মৃত্যুতে যেন মুহূর্তেই অন্ধকার নেমে এসেছে পুরো পরিবারে। যে ছেলেটি বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে একটু হাসি ফোটানোর জন্য হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়েছিলেন, সেই ছেলেটিই আজ নেই। যে বাবা-মা বুকভরা আশা নিয়ে সন্তানের অপেক্ষায় ছিলেন, তাদের সেই অপেক্ষা এখন পরিণত হয়েছে আজীবনের কান্নায়।
পরিবারের স্বজনরা জানান, সংসারে অভাব ছিল। সেই অভাব ঘোচাতে এবং পরিবারের ভবিষ্যৎ একটু ভালো করার আশায় ফয়সাল বিদেশে পাড়ি জমান। নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের কথা না ভেবে বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই ছোট ছেলেকে রেখে দুবাইয়ে শুরু করেন প্রবাসজীবন। কঠোর পরিশ্রম করে উপার্জিত অর্থ দিয়ে পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি।
বিশেষ করে বাবা-মায়ের জন্য একটি ভালো টিনের ঘর বানানোর স্বপ্ন ছিল ফয়সালের। হয়তো দেশে ফিরে নিজের হাতে সেই ঘরটি বানাবেন, বৃদ্ধ বাবা-মাকে একটু স্বস্তিতে রাখবেন—এমন স্বপ্নই তাকে দূর প্রবাসের কষ্ট সহ্য করার শক্তি দিত। কিন্তু ঘর বানানোর আগেই জীবনের ঘর ছেড়ে চলে যেতে হলো তাকে।
ফয়সালের সবচেয়ে বড় অসহায় রেখে যাওয়া তাঁর দুই ছোট ছেলে। যে বয়সে সন্তানদের বাবার হাত ধরে হাঁটার কথা, বাবার কাঁধে চড়ে আনন্দ করার কথা, সেই বয়সেই তারা হারাল বাবাকে। বাবার স্নেহের হাত আর কোনোদিন মাথায় পড়বে না, বাবার কণ্ঠে ডাক শুনবে না—এই নির্মম বাস্তবতা হয়তো এখনো তারা বুঝে উঠতে পারেনি।
ফয়সালের স্ত্রীও হারিয়েছেন তাঁর সংসারের সবচেয়ে বড় অবলম্বনকে। আর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য এই মৃত্যু যেন সন্তানের মৃত্যুর চেয়েও বড় এক শূন্যতা। যে সন্তানকে ঘিরে ছিল তাদের শেষ বয়সের ভরসা, সেই সন্তানই আজ পরপারে।
একজন প্রবাসী শুধু একজন মানুষ নন—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও বেঁচে থাকার গল্প। ফয়সালও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। নিজের পরিবারকে ভালো রাখার জন্য দূর দেশে গিয়ে জীবনযুদ্ধে নেমেছিলেন তিনি। অথচ মাত্র ২৭ বছর বয়সে একটি স্ট্রোক সব স্বপ্ন, সব পরিকল্পনা, সব অপেক্ষা এক নিমিষেই শেষ করে দিল।
ফয়সালের মৃত্যুসংবাদ এলাকায় পৌঁছালে স্বজন, প্রতিবেশী ও পরিচিতজনদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খুঁজে পাচ্ছেন না। আর যে বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য ফয়সাল বিদেশে গিয়েছিলেন, সেই বাবা-মায়ের চোখের পানি যেন এখন আর থামছেই না।
একটি টিনের ঘর, বাবা-মায়ের একটু সুখ, স্ত্রী-সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ—ফয়সালের ছোট ছোট স্বপ্নগুলো আর কোনোদিন পূরণ হবে না। স্বপ্নগুলো পড়ে থাকবে, পড়ে থাকবে প্রিয়জনদের অপেক্ষা। শুধু ফিরবেন না ফয়সাল—ফিরবে না তাঁর কণ্ঠের সেই পরিচিত ডাকও।