দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় ধরে কার্যক্রম পরিচালনার পর র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ (এসআরবি) নামে নতুন একটি বিশেষায়িত বাহিনী গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া জনমতের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত আইনে বাহিনীর দায়িত্ব ও ক্ষমতার বড় ধরনের পরিবর্তন না এলেও জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য নতুন কিছু বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, এসআরবি বাংলাদেশ পুলিশের অধীন একটি বিশেষায়িত ইউনিট হিসেবে কাজ করবে। বাহিনীর প্রধান হবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠন করা যাবে। সদর দপ্তর ঢাকায় থাকলেও দেশের যেকোনো স্থানে ইউনিট স্থাপনের সুযোগ থাকবে।
শুধু পুলিশ নয়, অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থেকেও প্রেষণে সদস্য নিয়ে এসআরবি গঠন করা যাবে। প্রেষণে নিয়োগের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খসড়া আইনে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, অবৈধ অস্ত্র ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক দমন, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা, মানবপাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ এবং সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব এসআরবির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি আদালত, সরকার বা পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) নির্দেশে মামলা দায়ের ও তদন্ত পরিচালনার ক্ষমতাও থাকবে বাহিনীটির।
ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা থাকবে এসআরবির সদস্যদের। এছাড়া তদন্ত পরিচালনার দায়িত্ব অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দেওয়ার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এজন্য বাহিনীর নিজস্ব হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষও থাকবে।
খসড়া আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হলো ‘অভিযোগ প্রতিকার কমিটি’। এসআরবির সদস্যদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অসদাচরণ বা হয়রানির অভিযোগ সরাসরি এই কমিটির কাছে করতে পারবেন সাধারণ নাগরিক।
কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা, পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি।
এই কমিটি অভিযোগ তদন্ত, প্রয়োজনে অনুসন্ধান দল গঠন এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করতে পারবে। বাহিনীর কার্যক্রমে অবৈধ প্রভাব, হয়রানি, পদায়ন, পদোন্নতি ও বিভাগীয় শাস্তি সংক্রান্ত অভিযোগও পর্যালোচনা করবে কমিটি।
আইনের খসড়ায় এসআরবির সদস্যদের জন্য পৃথক শৃঙ্খলাবিধিও নির্ধারণ করা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য, মাদকাসক্ত অবস্থায় দায়িত্ব পালন, বেআইনিভাবে অর্থ আদায়, সরকারি অস্ত্রের অপব্যবহার, অপরাধীকে পালাতে সহায়তা কিংবা অন্য কোনো অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী, নতুন আইন কার্যকর হলে র্যাবের সব সম্পদ, জনবল, তহবিল, দায়-দায়িত্ব, চলমান মামলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও বিদ্যমান চুক্তি এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে। নতুন বিধিমালা প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত র্যাবের বিদ্যমান প্রয়োজনীয় কার্যবিধি অভিযোজনের মাধ্যমে বহাল থাকবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জনমত গ্রহণ শেষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মতামত নিয়ে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। পরে মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। অনুমোদন পেলে আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে।