মোঃ হোসেন, মনপুরা (ভোলা) প্রতিনিধি
বর্ষার এই সময়টায় মেঘনা নদীতে সাধারণত ইলিশের প্রাচুর্য থাকে। নদীর বুকে জাল ফেললেই ধরা পড়ে রুপালি ইলিশ। মাছে ভরে ওঠে ঘাট, মুখে হাসি ফুটে জেলেদের। কিন্তু চলতি মৌসুমে সেই পরিচিত দৃশ্য যেন অনেকটাই অনুপস্থিত।
ভরা মৌসুম হলেও ভোলার মনপুরা উপজেলার মেঘনা নদীতে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা। ফলে দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে হাজারো জেলে পরিবারে।
প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নদীতে জাল ফেলছেন জেলেরা। কেউ ফিরছেন অল্প কিছু মাছ নিয়ে, আবার কেউ ফিরছেন প্রায় খালি হাতে। মাছ বিক্রি করে জ্বালানি তেল, বরফ ও শ্রমিকের খরচই উঠছে না অনেকের। এতে দিন দিন বাড়ছে আর্থিক সংকট।
মনপুরার হাজিরহাট, দক্ষিণ সাকুচিয়া, উত্তর সাকুচিয়া ও চরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলেপল্লী ঘুরে দেখা যায়, মাছ না পাওয়ার হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে জেলে পরিবারগুলোর মধ্যে। অনেকেই ধারদেনা করে নদীতে মাছ ধরতে যাচ্ছেন। কিন্তু আশানুরূপ ইলিশ না পাওয়ায় সেই ঋণ পরিশোধ নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা।
স্থানীয় জেলে আব্দুল করিম বলেন, “প্রতিদিন নদীতে যাই, কিন্তু মাছ খুব কম পাচ্ছি। আগে এক জালে যত ইলিশ উঠত, এখন কয়েকবার জাল ফেলেও তত মাছ পাওয়া যায় না। সংসার চালানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
,আরেক জেলে মো. সেলিম জানান, “তেল, বরফ আর খাবারের খরচ বেড়েছে। নদীতে গিয়ে যদি মাছই না পাই, তাহলে পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব? এখন আমরা খুবই দুশ্চিন্তায় আছি।
শুধু জেলেরাই নন, এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় মাছঘাট ও আড়তগুলোতেও। ঘাটে ইলিশের সরবরাহ কম থাকায় আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য নেই। ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বিপাকে।
একজন মাছ ব্যবসায়ী বলেন, “ভরা মৌসুমে সাধারণত ঘাটে ইলিশে ভরে যায়। এবার সেই তুলনায় মাছ অনেক কম আসছে। ফলে ব্যবসাও আগের মতো হচ্ছে না।
স্থানীয় প্রবীণ জেলেদের মতে, কয়েক বছর আগেও এই সময়ে মেঘনায় প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ত। কিন্তু নদীর স্রোত, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং পরিবেশগত নানা কারণে পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘেট।
এ বিষয়ে উপজেলা মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তা উজ্জ্বল বনিক জানান, ইলিশের চলাচল অনেকটাই নদীর পরিবেশ, জোয়ার-ভাটা এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। আগামী দিনগুলোতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে ইলিশের পরিমাণ বাড়তে পারে বলে তারা আশা করছেন।
তবে আশার চেয়ে বাস্তবতার চাপই এখন বেশি অনুভব করছেন মনপুরার জেলেরা। প্রতিদিন জীবিকার সন্ধানে নদীতে ছুটছেন তারা। জাল ফেলছেন, অপেক্ষা করছেন রুপালি ইলিশের। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা না মেলায় তাদের চোখেমুখে ফুটে উঠছে উদ্বেগ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার ছাপ মেঘনার ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে জীবন কাটানো এই মানুষগুলোর একটাই প্রত্যাশা—নদীতে ফিরুক ইলিশের ঝাঁক, ঘরে ফিরুক স্বস্তি আর জীবিকার নিশ্চয়তা।