ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিকে ঘিরে নতুন করে তীব্র সমালোচনায় মুখ খুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। তিনি সরাসরি অভিযোগ করে বলেছেন,
বিএনপি এখন আর আগের রাজনৈতিক দল নেই, বরং দলটি চাঁদাবাজ ও টেন্ডারবাজদের দখলে চলে গেছে। তার ভাষায়, যে বিএনপি একসময় আদর্শ, আন্দোলন ও ত্যাগের রাজনীতি করত, সেই বিএনপিকে এখন আর চিনতে পারছেন না দলটির পুরোনো নেতাকর্মীরাও।
রোববার রাতে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মহিচাইল উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উপজেলা এনসিপি আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হাসনাত আব্দুল্লাহ এসব মন্তব্য করেন। তিন দিনব্যাপী কুমিল্লা পদযাত্রার প্রথম দিনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতা দখল ও প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তোলেন।
হাসনাত বলেন, বিএনপির তৃণমূলের অনেক নেতাকর্মী এখন হতাশ। তারা নিজেরাই অভিযোগ করছেন—দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন করেছেন, জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, পরিবার ছেড়ে রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছেন, কিন্তু আজকের বিএনপি সেই দলের প্রতিনিধিত্ব করছে না। তিনি দাবি করেন, বিএনপির ভেতরেই এখন ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। কারণ দলটি আদর্শিক রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ক্ষমতাকেন্দ্রিক স্বার্থের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে।
এনসিপির এই নেতা আরও বলেন, শুধু রাজনৈতিক দল নয়, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোও দখলের সংস্কৃতির মধ্যে পড়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, দুদক, মানবাধিকার কমিশন, বিচার বিভাগ, ব্যাংকিং খাত এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত ‘মাফিয়াকায়দায়’ নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। তার দাবি, বিসিবি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের শিকার।
হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অংশ ছিল তার দেওয়া ইংরেজি স্লোগান—‘বিএনপি ইজ রিজেক্ট’। তিনি বলেন, জনগণ পরিবর্তনের জন্য আন্দোলন করেছিল, কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই আবার ফিরে এসেছে। তার ভাষায়, মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্র কাঠামোর পরিবর্তন, কিন্তু এখনো একই ধরনের দখলদারিত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও গোষ্ঠীকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ চলছে।
তিনি বলেন, শুধু সরকার পরিবর্তন করলেই হবে না, পুরো সিস্টেম বদলাতে হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনসেবা খাতে সংস্কার আনার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় সুবিধা সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে নিশ্চিত করতে হবে। সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রকে জিম্মি করে রাখলে জনগণের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হবে না।
সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির কেন্দ্রীয় মুখ্য যুগ্ম সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ্, উপজেলা এনসিপির সমন্বয়ক আবুল কাশেম অভি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা। অনুষ্ঠানে উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির মাওলানা মোশারফ হোসেন, কুমিল্লা উত্তর জেলা খেলাফত মজলিশের সহসভাপতি মাওলানা মতিউর রহমান ফরাজীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব উপস্থিত ছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশে বিরোধী রাজনীতির ভেতরে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই ধরনের বক্তব্য। বিশেষ করে বিএনপির বিরুদ্ধে ‘দখলদার রাজনীতি’ ও ‘পুরোনো বন্দোবস্ত’ ফিরিয়ে আনার অভিযোগ তুলে এনসিপি নিজেদেরকে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে বলেও মনে করা হচ্ছে।