চয়ন কুন্ডু, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়
“আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে-এই বাংলায়…”
জীবনানন্দ দাশের চিরচেনা কবিতার পঙ্ক্তির মতো বাংলার প্রকৃতি বারবার নতুন রূপে ধরা দেয় ঋতুর আবর্তনে। রূপসী বাংলার প্রকৃতিতে কার্তিকে শুরুতেই বইছে হেমন্তের আবহ। বাতাসে বইতে শুরু করেছে শীতের আগাম হিমেল পরশ। ভোরে স্নিগ্ধ বাতাস, ঘাসের ডগায় জমে থাকা মুক্তাদানার মতো শিশিরবিন্দু আর প্রকৃতির নীরব রূপবদল মনে করিয়ে দিচ্ছে–‘শীত আসছে’। ঋতু পরিবর্তনের এই সমীরণে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাসেও প্রকৃতির রূপে দেখা দিয়েছে নতুন আমেজ।
ছয় ঋতুর বৈচিত্র্যময় আবর্তনে কার্তিক ও অগ্রহায়ণ–এই দুই মাস মিলে হেমন্ত ঋতু। এ সময় প্রকৃতি ধীরে ধীরে তার পুরোনো রূপ বদলে শীতের প্রস্তুতি নেয়। ইবির ১৭৫ একরের সবুজ প্রাঙ্গণে এখন সেই পরিবর্তনের ছোঁয়া স্পষ্ট। ভোরে কুয়াশার চাদর জড়িয়ে থাকে কেন্দ্রীয় ফুটবল মাঠ থেকে শুরু করে মুক্তমঞ্চ ও মীর মুগ্ধ সরোবর এলাকা। মাঠের শিশিরভেজা ঘাসের ডগায় ভোরের রোদ পড়তেই তা দ্যুতি ছড়ায়। মনে হয়, সবুজ ঘাসগুলো যেন প্রকৃতির বুকে সতেজ নিঃশ্বাস ফিরে পেয়েছে। শীতের এই প্রাথমিক পরশ শিক্ষার্থীদের মনেও জাগিয়ে তুলছে ভিন্ন এক শিহরণ। গাছপালা ঘেরা ছায়ানিবিড় পথ, খোলা প্রাঙ্গণ আর চারপাশের মেঠো গন্ধ ক্যাম্পাসকে সাজিয়ে তুলেছে এক অনন্য সৌন্দর্যে। সকালে কুয়াশা ভেদ করে ক্লাসে ছুটে চলা, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা কিংবা ধোঁয়া ওঠা চায়ের আড্ডা–ক্যাম্পাসজীবনের পরিচিত দৃশ্যগুলোতে শীত এখন নতুন মাত্রা যোগ করছে।
হেমন্তের এই আবহাওয়ায় অনুভূতি ব্যক্ত করে বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী অর্পিতা পাল বলেন,
“কার্তিকের শুরু থেকেই আবহাওয়ার পরিবর্তন স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছে। সকালে ক্যাম্পাসের বাতাসে শীতের একটা মিষ্টি আমেজ থাকে, যা ভীষণ ভালো লাগে। ক্লাসের ফাঁকে চায়ের দোকানে বসে ধোঁয়া ওঠা কাপে চুমুক দেওয়া এখন আমাদের নিত্যদিনের আনন্দ। তবে শীতের তীব্রতা বাড়লে সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে আসাটা একটু কঠিন হয়ে উঠবে।”
সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আশেক রহমান বলেন,
“শরতের বিদায়ের পর হেমন্তের এই ঠান্ডা বাতাস নতুন এক অনুভূতির জন্ম দেয়। বিশেষ করে ক্যাম্পাসের সবুজ পথগুলো দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যে অনুভূতি হয়, তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। তবে একই সাথে আমাদের মনে রাখা উচিত, শীত অনেকের জন্যই কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ক্যাম্পাসের আশপাশের অসচ্ছল ও শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানবিক উদ্যোগগুলো এখনই নেওয়ার উপযুক্ত সময়।”
ক্যাম্পাসের অন্যতম পরিচিত স্থান ‘জিয়া মোড়’। শীতের আভাস পেতেই এই মোড়ের চায়ের দোকানগুলোতে ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। জিয়া মোড়ের এক চা-বিক্রেতা অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন,
“কার্তিকের শুরুতেই ভোরবেলায় পুরো ক্যাম্পাস কুয়াশায় ঢেকে যায়। ঠাণ্ডা কিছুটা বাড়ায় শিক্ষার্থীরা হালকা গরম পোশাক পরা শুরু করেছে, যা ক্যাম্পাসে এক নতুন রূপ তৈরি করেছে। ভোর আর সন্ধ্যায় এক কাপ গরম চায়ের চাহিদা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি। গরম চায়ের কাপে শিক্ষার্থীদের এই আড্ডা পুরো ক্যাম্পাসের শীতকালীন পরিবেশকে প্রাণবন্ত করে তোলে।”
কার্তিকের শুরুতেই ইবি ক্যাম্পাসে শীতের আগাম উপস্থিতি কেবল ঋতু পরিবর্তনের বার্তা নিয়ে আসেনি; এটি প্রকৃতি, ক্যাম্পাসজীবন ও শিক্ষার্থীদের অনুভূতিকে নতুন করে উজ্জীবিত করার এক চমৎকার উপলক্ষ্য নিয়ে এসেছে। শীতের এই সৌন্দর্য যেমন আনন্দের, তেমনি অসচ্ছল মানুষদের কথা ভেবে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়াও এই ঋতুর অন্যতম শিক্ষা।