শিল্পকলা একাডেমির সামনে দেয়ালে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি কালি দিয়ে মোছার চেষ্টার ঘটনায় করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’-এর সদস্যসচিব আ ন ম আয়াসসহ চারজনকে বিভিন্ন মেয়াদে রিমান্ডে পাঠানো হয়েছে।
আয়াসকে ৩ দিন এবং মারজিয়া খন্দকার রিমিকে ২ দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। এ ছাড়া সাকিবুল হাসানকে ৩ দিন ও সুজন মিয়াকে ২ দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত।
রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন মাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম শুনানি শেষে এসব আদেশ দেন।
এদিন আসামিদের আদালতে হাজির করেন তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল গাফফার হিমেল। তিনি আসামিদের আদালতে হাজির করে দশ দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই শাহ আলম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
আদালতে রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। তিনি আদালতে বলেন, ‘আমাদের দেশে মানুষ রাস্তাঘাটে হাটতে পারে না, এজন্য ফুটপাত উচ্ছেদ করে আমাদের সংস্কৃতির সাথে যারা জড়িত তাদের ছবি আঁকা হয়েছে। তারই অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আসামিরা সেগুলো মুছে দিয়ে মূলত সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া তারা ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে। আসামি আয়াস বিভিন্ন সময়ে নানা বক্তব্য দিয়ে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। সে মানুষকে গালাগালি করে বিদ্বেষ সৃষ্টি করে পরিবেশ নষ্ট করার কাজে লিপ্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামনে দুর্গা পূজা। আমরা এ দেশে হিন্দু মুসলিম বসবাস করি,। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মুখে কালি দিয়ে হিন্দু সস্প্রদায়কে মূলত পূজার আগে উসকানি দেওয়া হলো।’
রাষ্ট্র পক্ষের আইনজীবী বলেন, ‘ভাইরাল হওয়ার জন্য রাস্তাঘাটে গালাগালি করতে হবে? সরকার এবং জনগণের বিরুদ্ধে তারা বিভিন্ন সময় উসকানিমূলক কথা বলছে। সরকারের কাজকে তারা চ্যালেঞ্জ করেছে এ ঘটনার মাধ্যমে। ইচ্ছাকৃতভাবে তারা এ ঘটনার সৃষ্টি করেছে।
তিনি বলেন, ‘এর পেছনে কারা আছে সেটা জানা দরকার। কারণ এসব করতে টাকা-পয়সা খরচ হয়। তদন্তের স্বার্থে আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ড প্রয়োজন।’
ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, ‘দেশে অনেকেই জুলাই যোদ্ধা দাবি করে। জুলাই যোদ্ধা বর্তমানে দেশে সবাই। কিন্তু আমরা দাবি করিনা। যাদের আগে কোনো পরিচয় ছিলোনা তারা এখন জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেয়। জুলাই যোদ্ধা বলে আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। যা ইচ্ছে তা করা যাবেনা। পাকিস্তানে কার কবর আছে সেগুলো তো টানার দরকার ছিল না।’
অন্যদিকে আয়াসদের আইনজীবী মনির হোসেন সুমনসহ কয়েকজন রিমান্ড বাতিল চেয়ে শুনানি করেন। তারা আদালতে বলেন, ‘সব আসামি জুলাই যোদ্ধা। এ ছাড়া নারী আসামি রিমির ৩ বছরের বাচ্চা আছে।’
এসব উল্লেখ করে রিমান্ড নামঞ্জুর করে জামিনের আবেদন করেন তারা। পরে বিচারক দুগ্ধপোষ্য শিশু কি না জিজ্ঞেস করেন। শুনানি শেষে আদালত রিমান্ডের আদেশ দেন।
মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি মোছার চেষ্টার ঘটনায় শাহবাগ থানার এসআই জিয়াউল হক রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করেন।
ধারা অনুযায়ী, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার বিষয়টিকে অন্তর্ভূক্ত করেছেন মামলার বাদী।
এর আগে, শিল্পকলা একাডেমির সামনের দেয়ালে শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি মুছতে গিয়ে পুলিশের বাঁধার মুখে পড়েন একদল তরুণ। এর জেরে উভয়পক্ষের বাগ-বিতণ্ডার মধ্যে আয়াসসহ ৪ জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।
ঘটনাস্থলে এক নারীকে রবীন্দ্রনাথের প্রতিকৃতিতে কালি দিতে দেখা যায়, তখন এক পুলিশ সদস্য তাকে বাধা দেন। তখন ওই নারী জানান, তারা ‘ভারতীয় আগ্রাসনের প্রতিবাদ’ জানাতে এসেছেন। পুলিশি বাধার মুখে আয়াসের নেতৃত্বে তারা স্লোগানও দেয়।
গত ৫ অক্টোবর সেগুনবাগিচার ফুটপাত দখলমুক্ত করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এরপর ফুটপাতের দেয়ালে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, সত্যজিৎ রায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও কাজী নজরুল ইসলামসহ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অবদান রাখা ১০ গুণী ব্যক্তিত্বের ছবি আঁকা হয়।
এর আগে, শুক্রবার ‘জুলাই রেভ্যুলুশনারি অ্যালায়েন্স’ নামের একটি ফেইসবুক পেইজ থেকে এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের ছবি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। সত্যজিৎ রায় কিংবা ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে ‘পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’ আখ্যা দিয়ে তাদের প্রতিকৃতি আঁকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। শনিবার ‘রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম’ এর আয়াসের নেতৃত্বে সেসব ছবি মুছতে যায় একদল লোক।