পাঠকের পদচারণায় মুখর থাকার কথা যে পাঠাগারের, সেখানে এখন সুনসান নীরবতা। দরজায় ঝুলছে তালা, ভেতরে পড়ে আছে বই ও আসবাবপত্র। বাইরের সামনের অংশ দখল করে রাখা হচ্ছে অটোরিকশা, আশপাশে ময়লা-আবর্জনা ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ।
রাতের বেলায় ছাদে মাদকসেবীদের আড্ডা বসারও অভিযোগ রয়েছে। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলা সদরের পাবলিক মাঠসংলগ্ন সাধারণ পাঠাগারের বর্তমান চিত্র এটি। অযত্ন ও অবহেলায় পাঠাগারটি বই প্রেমীদের জ্ঞানের আলো ছড়াতে পারছেনা।
জানা গেছে, প্রায় চার দশক আগে প্রতিষ্ঠিত এ পাঠাগারের জন্য প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি নতুন ভবন নির্মিত হয়। পাঠাগারেরর নতুন ভবনটি উদ্বোধনের প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো চালু হয়নি। পরিচালনা কমিটি ও কেয়ারটেকার না থাকায় ভবনটি অব্যবহৃত পড়ে আছে। এতে পাঠাগারের বই ও আসবাবপত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পরও পাঠাগারটি চালু না হওয়ায় হতাশ স্থানীয় শিক্ষার্থী, পাঠক ও বইপ্রেমীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নিয়াজ উদ্দিন মিয়ার সময়ে বাউফল পাবলিক মাঠের পূর্ব পাশে সাধারণ পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বাউফল সরকারি কলেজের সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুল সাত্তার। পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব পালন করেন কেশবপুর কলেজের সাবেক অধ্যাপক এ কে এম হুমায়ুন কবির।
একসময় পাঠাগারটি ছিল এলাকার জ্ঞানচর্চা ও সংবাদপত্র পাঠের অন্যতম স্থান। সদস্যদের ভোটে পরিচালনা কমিটি গঠন করা হতো। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত পাঠাগারটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকত। শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সেখানে বই ও সংবাদপত্র পড়তে আসতেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে পুরোনো ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়লে পাঠাগারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। পরে স্থানীয় তরুণ, যুবক, শিক্ষার্থী ও কয়েকজন সাংবাদিকের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাউফলের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ এবং উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুল মোতালেব হাওলাদার নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন। উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে প্রায় ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ভবনটি নির্মাণ করা হয়। তবে নতুন ভবন নির্মিত হলেও দীর্ঘদিন তা তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে ছিল।
প্রায় দুই বছর আগে ভবনটির উদ্বোধন করা হলেও এখন পর্যন্ত পাঠাগারের কার্যক্রম শুরু হয়নি। ফলে নতুন ভবন নির্মাণের মধ্য দিয়ে এলাকার মানুষের মধ্যে যে আশার সঞ্চার হয়েছিল, তা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা যায়, পাঠাগারের ভেতরে বই ও আসবাবপত্র পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় সেগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ভবনের সামনের জায়গা দখল করে সারিবদ্ধভাবে রাখা হচ্ছে অটোরিকশা। আশপাশে মূত্রত্যাগের কারণে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় পাঠাগারের ছাদে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। ফলে পাঠাগারটির পরিবেশ ও নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পাঠাগারের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, পাঠাগারটি চালু হলে শিক্ষার্থীসহ এলাকার সাধারণ মানুষ বই পড়ার সুযোগ পেতেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এটি চালু না হওয়ায় বই ও আসবাবপত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত পাঠাগারটি চালু করে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করার দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে বাউফল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সালেহ আহমেদ বলেন, “এই সপ্তাহের মধ্যে পাঠাগারটি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করে শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের জন্য খুলে দেওয়া হবে।”
স্থানীয়রা প্রত্যাশা করছেন, শুধু ভবন নির্মাণ ও উদ্বোধনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত পাঠাগারটির নিয়মিত কার্যক্রম শুরু করা হোক। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠবে এবং বাউফলের পুরোনো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রটি আবারও প্রাণ ফিরে পাবে।