মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি
রাজধানী ঢাকার সঙ্গে মুন্সীগঞ্জের চার উপজেলার যোগাযোগ সহজ করার লক্ষ্যে নেওয়া মোল্লাবাজার সেতু নির্মাণ প্রকল্প যেন দীর্ঘসূত্রতার বৃত্তেই আটকে আছে। ধলেশ্বরীর শাখা নদীর ওপর ২৫২ মিটার দীর্ঘ এই সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে। নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেছে, পরিবর্তন হয়েছে সরকারের, বাতিল হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিও। অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলেও ২০২৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সেতুটি চালু করা সম্ভব হয়নি।
প্রকল্পের কাজ শেষ করার প্রথম সময়সীমা ছিল ২০২০ সালের ৫ ডিসেম্বর। ওই সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২২ সাল পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু বর্ধিত সময়েও নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়নি। এভাবে একের পর এক সময় পেরিয়ে গেলেও সেতুটি চালুর অপেক্ষা শেষ হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রের হিসাবে, বর্তমানে নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৮০ শতাংশের কিছু বেশি। বাকি কাজ কবে শেষ হবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা পাওয়া যায়নি।
সেতুটি ঘিরে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা দীর্ঘদিনের। এটি চালু হলে সিরাজদীখান, টঙ্গিবাড়ী, লৌহজং ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার বাসিন্দাদের রাজধানীতে যাতায়াত সহজ হবে। যানজট এড়িয়ে কম সময়ে ঢাকায় পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা তাঁদের। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় সেই প্রত্যাশার বাস্তবায়ন হচ্ছে না। সেতুর সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য নির্মিত সড়কও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
নির্মাণস্থলের বর্তমান পরিস্থিতিতে দেখা যায়, সেতুর মূল কাঠামোর কিছু অংশের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে মাঝের স্প্যানের ওপর ঢালাইসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ বাকি রয়েছে। দুই পাশের সংযোগ সড়ক ও আনুষঙ্গিক নির্মাণকাজও শেষ হয়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজের গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। নির্মাণস্থলে প্রয়োজনীয় লোকবল ও কর্মতৎপরতার ঘাটতিও চোখে পড়ছে বলে দাবি তাঁদের।
প্রায় নয় বছর ধরে চলা নির্মাণকাজের ধীরগতিতে ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা ও নিয়মিত যাতায়াতকারীরা। তাঁদের প্রশ্ন, একটি সেতুর নির্মাণকাজ শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় লাগছে কেন? নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও প্রকল্পটি অসম্পূর্ণ থাকায় কবে নাগাদ সেতুটি চালু হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ৩৩ কোটি ২৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা ব্যয়ে সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ৬ জুলাই। সুরমা এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কাজটি দেওয়া হয়েছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৩টি খুঁটির ওপর ১২টি স্প্যান বসিয়ে ২৫২ মিটার দৈর্ঘ্য ও প্রায় ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রস্থের সেতুটি নির্মাণের কথা।
প্রথম দফায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে না পারায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এরপরও নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ২০২৪ সালেও সেতুর কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কাজে গাফিলতির অভিযোগ তুলে তাদের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়।
অবশিষ্ট নির্মাণকাজ শেষ করতে পরবর্তী সময়ে নতুন করে প্রায় ১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে অতিরিক্ত বরাদ্দের পরও কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। নির্মাণকাজের অগ্রগতি ৮০ শতাংশের কিছু বেশি হলেও বাকি অংশ সম্পন্ন করে সেতুটি চালুর নির্দিষ্ট দিনক্ষণ এখনো জানানো যাচ্ছে না।
২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের সময় পেরিয়েছে পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার এবং বিএনপি সরকারের আমলেও। তিন সরকারের সময়কাল অতিক্রম করেও সেতুটি চালু না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। রাজধানীর সঙ্গে যোগাযোগ সহজ করার যে উদ্দেশ্যে সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা বাস্তবায়নের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে।
এ বিষয়ে সিরাজদীখান উপজেলা প্রকৌশলী মো. আসিফ উল্লাহ বলেন, “মোল্লাবাজার সেতু নিয়ে আমাদের একটি মিটিং হয়েছে। মাঝখানের স্প্যানের ওপর ঢালাইয়ের কাজের প্রস্তুতি চলছে।”
সেতুটির নির্মাণকাজ কবে নাগাদ শেষ হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।
ফলে নির্মাণকাজের শেষ পর্যায়ে এসেও সেতুটি চালুর সময় নির্ধারিত না হওয়ায় স্থানীয়দের অপেক্ষা দীর্ঘ হচ্ছে। এখন তাঁদের প্রত্যাশা, বাকি কাজ দ্রুত শেষ করে সেতুটি যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে।