রাফি হোসেন , কুবি প্রতিনিধি
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) হত্যা মামলায় দুই কিশোরসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেছে পুলিশ।
গত মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) মামলার তদন্ত শেষে এ অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এতে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিতে বাধা দেওয়ায় অপ্রতিমকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) জেলা পুলিশের মিডিয়া কর্মকর্তা ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাজ শেষ করে চার্জশিট আদালতে পাঠিয়েছি। এখন বাকি কাজ আদালত করবে।’
অভিযোগপত্রে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিন (১৯), মো: সিয়াম (১৯) এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোরকে অভিযুক্ত করা হয়েছে৷ তাঁদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। শিশু আইন অনুযায়ী, দুই কিশোরকে অভিযোগপত্রে শিশু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তারা বর্তমানে গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের সঙ্গে থাকা আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে তুহিন অপ্রতিমকে সঙ্গে নিয়ে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়সংলগ্ন সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে যায়।
সেখানে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে অপ্রতিম বাধা দেয়। এ নিয়ে ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তুহিন প্রথমে এবং পরে আরও দুজন বাঁশের লাঠি দিয়ে তার মাথায় আঘাত করে। এতে অপ্রতিমের মৃত্যু হয় বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের তদন্তে তুহিনের পাশাপাশি মোজাফ্ফর হোসেন ফাহাদ ও কামরুল হাসানের সরাসরি অংশগ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে, সিয়ামের বিরুদ্ধে হত্যার পরিকল্পনা ও সহযোগিতার অভিযোগ রয়েছে বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তার সঙ্গে থাকা তুহিনকে শনাক্ত করা হয়। পরে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফাহাদ ও কামরুলকে আটক করে পুলিশ। তুহিনের বাসায় অভিযান চালিয়ে অপ্রতিমের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তদন্তে সিয়ামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়ে তাকেও গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তুহিন এবং ১৫ ও ১৬ বছর বয়সী দুই কিশোর আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।
অভিযোগপত্র দাখিলের পর নিহত অপ্রতিমের বাবা ও মামলার বাদী কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার দ্রুত বিচার শেষ করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে ঘিরেই আমাদের বাঁচার স্বপ্ন ছিল।
সেই স্বপ্ন খুনিরা কেড়ে নিয়েছে। খুনিদের দ্রুত বিচার চাই। আদালতে দ্রুত সময়ের মধ্যে খুনিদের সর্বোচ্চ সাজা হবে, সেই আশা করছি। বয়সের ফারাককে কাজে লাগিয়ে যেন আসামিরা বেরিয়ে যেতে না পারে।’
অপ্রতিমের পরিবারের পক্ষ থেকে দুই কিশোরের প্রকৃত বয়স নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে তাদের বয়স নির্ধারণে ডিএনএ পরীক্ষার দাবিও আগে জানিয়েছিল পরিবার। অভিযোগপত্রের অনুলিপি পাওয়ার পর আইনজীবীর সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে তারা।
উল্লেখ্য, গত ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার বাসা থেকে আইফোন দিয়ে ছবি তুলতে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় অপ্রতিম। সে কোটবাড়ির বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
নিখোঁজ হওয়ার দিন রাতেই তার বাবা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরদিন ১৯ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শবর্তী বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
ঘটনাটি দেশজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। হত্যাকাণ্ডের পর কুমিল্লায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযানও জোরদার করে পুলিশ। অভিযোগপত্র দাখিলের মধ্য দিয়ে মামলার তদন্তপর্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শেষ হয়েছে। এখন আদালতের বিচারিক কার্যক্রম শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে অপ্রতিমের পরিবার।