কুষ্টিয়ায় জনসমাগমপূর্ণ স্থানে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও নগদ টাকা চুরির অভিযোগে একটি চক্রের ছয় সদস্যকে আটক করেছে পুলিশ। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে নগদ ২৯ হাজার ৮৯০ টাকা, কয়েকটি মোবাইল ফোন, ১৩টি খালি মোবাইল ফোনের বক্স এবং বিভিন্ন ধরনের লটারির কুপন উদ্ধার করা হয়েছে। তবে অভিযোগকারী রাকিবুল ইসলামের চুরি যাওয়া আইটেল এস২৩ মডেলের মোবাইল ফোনটি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার কুষ্টিয়া শহরের এন.এস. রোডে কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সামনে মোবাইল ফোন চুরির একটি ঘটনা থেকে এ চক্রের সন্ধান পায় পুলিশ। এ ঘটনায় জুয়েল মোল্লা ওরফে বাদশাকে প্রথমে আটক করা হয়। পরে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের সহায়তায় অভিযান চালিয়ে সাহেব আলীসহ আরও পাঁচজনকে আটক করা হয়।
আটক অন্য ব্যক্তিরা হলেন সাহেব আলী (৫৫), লিটন (৫২), সানমুন মিয়া (১৯), তোফাজ্জল হোসেন (৫৫) ও নুপুর (২৩)। তাঁদের বিরুদ্ধে কুষ্টিয়া মডেল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, গত ২০ অক্টোবর সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর এলাকার বাসিন্দা মো. রাকিবুল ইসলাম কুষ্টিয়া প্রেসক্লাবের সামনে এন.এস. রোড পার হচ্ছিলেন। এ সময় তাঁর পকেট থেকে প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের আইটেল এস২৩ মডেলের একটি মোবাইল ফোন চুরি করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনাটি বুঝতে পেরে রাকিবুল ইসলাম জুয়েল মোল্লা ওরফে বাদশাকে ধরে ফেলেন। এ সময় জুয়েল তাঁর কাছে থাকা চুরি করা মোবাইল ফোনটি সাহেব আলী নামের আরেক ব্যক্তির হাতে তুলে দেন বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সাহেব আলী মোবাইল ফোনটি নিয়ে দ্রুত ভিড়ের মধ্যে পালিয়ে যান। এরপর রাকিবুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গে থাকা লোকজন জুয়েলকে আটক করেন।
জুয়েলের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশকে বিষয়টি জানানো হলে কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশের সহায়তায় শহরের চর মিলপাড়া এলাকার শ্মশানঘাটসংলগ্ন লালন-রবীন্দ্র উদ্যানে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে সাহেব আলীসহ আরও পাঁচজনকে আটক করা হয়। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে নগদ ২৯ হাজার ৮৯০ টাকা, কয়েকটি মোবাইল ফোন, ১৩টি খালি মোবাইল ফোনের বক্স এবং বিভিন্ন ধরনের লটারির কুপন উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের কাছে দেওয়া তথ্য ও মামলার এজাহারে উল্লেখ করা অভিযোগ অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে লটারির আয়োজন ও লোকসমাগমকে কাজে লাগিয়ে ভিড়ের মধ্যে মানুষের মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, নগদ টাকা এবং অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী চুরি করে আসছিলেন। পরে চুরি করা মালামাল বিক্রি করা হতো বলেও এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া লটারির কুপন ও খালি মোবাইল ফোনের বক্সকে এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ আলামত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে অভিযানের সময় অভিযোগকারী রাকিবুল ইসলামের চুরি যাওয়া মোবাইল ফোনটি উদ্ধার করা যায়নি। উদ্ধার হওয়া অন্যান্য মোবাইল ফোনের মালিকানা শনাক্ত এবং সেগুলোর সঙ্গে কোনো চুরির ঘটনার যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এদিকে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় সম্প্রতি অনুষ্ঠিত লালন মেলা ও আখড়াবাড়ি এলাকায় একাধিক মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা নিয়েও আলোচনা চলছে। মেলা চলাকালে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগমের মধ্যে মোবাইল ফোন ও মূল্যবান সামগ্রী চুরির অভিযোগ উঠেছিল। এ পরিস্থিতিতে আটক ছয়জনের সঙ্গে লালন মেলা ও আখড়াবাড়ি এলাকার চুরির ঘটনাগুলোর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এসব ঘটনার সঙ্গে আটক ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আটক ব্যক্তিরা কত দিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাঁদের সঙ্গে আরও কেউ যুক্ত রয়েছেন কি না, চুরি করা মোবাইল ফোন কোথায় বিক্রি করা হতো এবং উদ্ধার হওয়া মালামালের প্রকৃত মালিক কারা, এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁদের বিরুদ্ধে অতীতে এ ধরনের কোনো অভিযোগ বা মামলা রয়েছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
এ ঘটনায় গত ২০ অক্টোবর কুষ্টিয়া মডেল থানায় ৪৩/৪০৭ নম্বরে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পেনাল কোড, ১৮৬০-এর ৪২০, ৩৭৯, ৪১১, ৪১৩ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কুষ্টিয়া মডেল থানার উপপরিদর্শক (নিরস্ত্র) মো. বাদশা মিয়া।
জনসমাগমপূর্ণ স্থানগুলোতে মোবাইল ফোন চুরির ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের মতে, মেলা, লটারি কিংবা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে মানুষের অতিরিক্ত ভিড়ের সুযোগ নিয়ে চোরচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো, সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কুষ্টিয়ায় আটক ছয়জনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা, সাম্প্রতিক মোবাইল চুরির ঘটনাগুলোর সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা এবং এর পেছনে আরও বড় কোনো চক্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারী রাকিবুল ইসলামের চুরি যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধার এবং এ চক্রের কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য উদ্ঘাটন এখন তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।