মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেনের হাতে পিস্তল নিয়ে কয়েকজনকে ধাওয়া করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গেণ্ডারিয়া রেললাইন সংলগ্ন এলাকায় শনিবার বিকেলে এ ঘটনা ঘটে বলে তার ফেসবুক পেজের পোস্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেকটি ভিডিওতে আটক ব্যক্তিদের পুলিশের হাতে তুলে দিতে দেখা যায়। ভিডিওতে দেখা যায়, প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের সঙ্গে থাকা আরও দুই ব্যক্তির হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
ঘটনাস্থলে থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক পাভেল শিকদার জানান, স্থানীয় লোকজনের বারবার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিমন্ত্রী বিকাল ৩টার দিকে সেখানে গিয়েছিলেন। পুলিশকেও জানানো হয়েছিল। তবে পুলিশ পৌঁছাতে দেরি করে।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাকের ঘটনায় নানা প্রশ্ন উঠেছে। তার মধ্যে রয়েছে— প্রতিমন্ত্রীর হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ কি না? বৈধ হলেও একজন প্রতিমন্ত্রী কি এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না? মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের যদি এভাবে অভিযান পরিচালনা করতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজ কী? সিস্টেম বা ব্যবস্থা ঠিক না করে এভাবে একজন প্রতিমন্ত্রীর অভিযান গ্রহণযোগ্য কি না?
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক বলেন, ‘তার হাতে থাকা অস্ত্রটি বৈধ।’ কিন্তু নির্বাচনের সময় রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দেওয়া তার হলফনামায় আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাক বলেন, ‘তিনি অস্ত্রটি নিয়েছেন ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করার পর। যখন তিনি এটি নিয়েছেন, তখন মনোনয়নপত্রে দেখানোর সুযোগ ছিল না।’ মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন ছিল ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর। প্রতিমন্ত্রী ইশরাক মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ২৮ ডিসেম্বর।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৫ সালের নীতিমালার ২৫ অনুচ্ছেদে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও ব্যবহারের শর্ত দেওয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদের ‘ক’ উপ–অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি স্বীয় লাইসেন্সে অন্তর্ভুক্ত অস্ত্র আত্মরক্ষার নিমিত্ত নিজে বহন/ব্যবহার করতে পারবেন। তবে অন্যের ভীতি/বিরক্তি উদ্রেক করতে পারে, এভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করা যাবে না।’
বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তিনি একজন জনপ্রতিনিধি। তার সংসদীয় আসনের মধ্যে গেন্ডারিয়ার রেলস্টেশন–সংলগ্ন দয়াগঞ্জ ঘুণ্টিঘর এলাকাটি পড়েছে। সেখানে মাদক ব্যবসা হয়। এলাকার মানুষ বারবার তার কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি পুলিশকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তবে কাজ হয়নি। এ কারণে বাধ্য হয়ে তিনি সেখানে গেছেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, পুলিশ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। তিনি অন্ততপক্ষে ৩০-৪০ বার পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা একেক সময় একেক কথা বলে। তাদের জনবল কম, গাড়ি নেই—এসব কথা বলে। এর আগে সেখানে অভিযান চালাতে গিয়ে কয়েকজন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। মাদক ব্যবসায়ীরা দূর থেকে গুলি করে দেয়। সে কারণে তার হাতে অস্ত্র ছিল। তিনি বলেন,
প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশনার পরও পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেয় না, জানতে চাইলে গেন্ডারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, ১১ অক্টোবর তারা ৩০০ পুলিশ নিয়ে অভিযান চালিয়েছেন। অভিযানে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যরা ছিলেন। প্রতিমন্ত্রীর অভিযোগের বিষয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সব সময় যোগাযোগ হয়। তারা অভিযান ও ফলাফলের বিষয়ে সব সময় জানান।
প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে পরিষ্কার–পরিচ্ছন্নতা, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ঠেকানোসহ বিভিন্ন অভিযানে গিয়ে ফেসবুকে ভিডিও দিতে দেখা যায়। তবে শনিবারের মাদকবিরোধী অভিযানের ভিডিওটি তার পেজ থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, সরকার ও মন্ত্রীদের কাজ হলো নির্দেশ দেওয়া। পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। মন্ত্রীকেই যদি অস্ত্র হাতে অভিযানে নামতে হয়, তাহলে পুলিশের কাজ কী?
শরীফ ভূঁইয়া বলেন, একজন প্রতিমন্ত্রী যেভাবে অস্ত্র প্রদর্শন করেছেন, তা বেআইনি।