ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করায় দুই প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে বাড়িতে আটকে রাখার অভিযোগে ভারতের আগ্রার এক বাবাকে ভর্ৎসনা করেছেন এলাহাবাদ হাইকোর্ট। একই সঙ্গে দুই বোনকে অবিলম্বে মুক্ত করে তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। পাশাপাশি বাবা ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে দুই বোনকে ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালত বলেছেন, সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার ধর্মীয় বিশ্বাস, ব্যক্তিগত পছন্দ বা জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত বাবা-মায়ের পছন্দ না হলেও তাকে আটকে রাখার কোনো সাংবিধানিক অধিকার তাদের নেই। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ব্যক্তিস্বাধীনতা ভারতের সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত।
গত ৬ আগস্ট বিচারপতি সন্দীপ জৈনের একক বেঞ্চ এ রায় দেন।
স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণের দাবি দুই বোনের
৩৫ ও ২০ বছর বয়সী দুই বোন আদালতকে জানান, তারা ২০২০ ও ২০২১ সালে নিজেদের ইচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। তাদের দাবি, ধর্ম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের প্রলোভন, জোরজবরদস্তি, চাপ বা অযাচিত প্রভাব কাজ করেনি।
আদালতে তারা অভিযোগ করেন, ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জানার পর তাদের বাবা বাড়িতে আটকে রাখেন এবং হিন্দুধর্মে ফিরে যাওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকেন। এ সময় তাদের ভয় দেখানো এবং দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও শারীরিকভাবে হয়রানি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
দুই বোন আরও জানান, তাদের পাসপোর্ট, শিক্ষাগত সনদ, পরিচয়পত্র, ব্যাংকের পাসবুক ও চেকবুক, ধর্ম পরিবর্তনসংক্রান্ত নথি এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত জিনিসপত্র বাবা নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।
বড় বোন এমএসসি, এমফিল ও বিএড ডিগ্রিধারী। ছোট বোন দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন।
তাদের আইনজীবী আলি বিন সাইফ ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’কে জানান, ২০২১ সালে বাবা মেয়েদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর গত বছর বাড়ি থেকে বের হয়ে কলকাতায় যাওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের আটকে রাখা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কলকাতা থেকে উদ্ধার, গ্রেপ্তার ১২ জন
গত বছর দুই বোন বাড়ি থেকে বেরিয়ে কলকাতায় চলে যান। পরে আগ্রা পুলিশ তাদের কলকাতা থেকে উদ্ধার করে। এ ঘটনায় অপহরণ ও জোর করে বিয়ে দেওয়ার অভিযোগে অন্তত ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে দুই বোনের আইনজীবীর দাবি, পুলিশ তাদের শেষ পর্যন্ত বাবার কাছে হস্তান্তর করে। পরে আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে দুই বোন তাদের আটকে রাখা ও নির্যাতনের অভিযোগ করেন।
‘ধর্মান্তর বড় ষড়যন্ত্র’, সরকারের দাবি
মামলার শুনানিতে উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল দাবি করেন, দুই নারীর ধর্ম পরিবর্তন একটি বড় ও সংঘবদ্ধ ষড়যন্ত্রের অংশ। এর সঙ্গে দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও ঐক্যের ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলেও দাবি করেন তিনি।
তদন্তকারীরাও আদালতে দাবি করেন, বেআইনি ধর্মান্তরের মাধ্যমে দেশের সামাজিক কাঠামো নষ্ট করার পরিকল্পনার সঙ্গে কিছু ব্যক্তি জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় বিদেশি সংস্থা বা বাইরের কোনো প্রভাব থাকার ইঙ্গিতও পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়।
তবে দুই বোনের আইনজীবী এসব দাবিকে অনুমাননির্ভর বলে উল্লেখ করেন। তার প্রশ্ন, দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজেদের ইচ্ছায় ধর্ম পরিবর্তন করলে সেটি কীভাবে দেশের সার্বভৌমত্ব বা অখণ্ডতার জন্য হুমকি হতে পারে?
সরকারের দাবি মানেনি হাইকোর্ট
সব পক্ষের বক্তব্য শোনার পর উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই দাবি গ্রহণ করেনি হাইকোর্ট। আদালত বলেন, দুই নারীর ইসলাম গ্রহণকে দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা ও ঐক্যের জন্য হুমকি হিসেবে দেখার মতো কোনো বড় ষড়যন্ত্রের যথেষ্ট ভিত্তি আদালতের সামনে নেই।
আদালত আরও বলেন, দুই বোনের বক্তব্য ছিল স্বতঃস্ফূর্ত, সুসংগত ও স্পষ্ট। তারা জোরজবরদস্তি, ভয়, প্রলোভন বা অযাচিত প্রভাবের কারণে ধর্ম পরিবর্তন করেছেন—এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায়নি।
বিচারপতি সন্দীপ জৈন বলেন, নিজেদের পছন্দের ধর্ম গ্রহণের কারণে দুই প্রাপ্তবয়স্ক নারীকে জোর করে আটকে রাখা আইনের শাসনের প্রতি গুরুতর অবমাননা। একই সঙ্গে এটি ভারতের সংবিধানের ২১ ও ২৫ অনুচ্ছেদে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন।
রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন
দুই নারীর স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। আদালত বলেন, নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
কিন্তু বেআইনিভাবে আটকে রাখার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের মুক্ত করার পরিবর্তে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সেই আটকাবস্থা চলতে দিয়েছে বলে আদালত পর্যবেক্ষণ করেন।
আদালতের মতে, সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার কারণে দুই নারীর মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের জন্য রাষ্ট্রকেও দায় নিতে হবে।
২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণের নির্দেশ
শেষ পর্যন্ত দুই বোনকে অবিলম্বে মুক্ত করে তাদের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে বাবা ও উত্তরপ্রদেশ সরকারকে যৌথভাবে দুই বোনকে ২৫ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আদালত অবশ্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন, মূল মামলার তদন্ত আইন অনুযায়ী চলবে। এই মামলার শুনানিতে আদালতের দেওয়া পর্যবেক্ষণ তদন্তের ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।
আদালত আরও জানান, সরকার চাইলে ক্ষতিপূরণের ৫০ শতাংশ বাবার কাছ থেকে এবং বাকি ৫০ শতাংশ এমন কোনো সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে আদায় করতে পারবে, যার কাজ বা নিষ্ক্রিয়তার কারণে দুই নারীর স্বাধীনতা অসাংবিধানিকভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
তুরস্ক, সৌদি ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশ নিয়ে ইসলামি সেনাবাহিনী গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে ইরান। আপনি কি এই আর্মি গঠনের পক্ষে?