ফরিদ মিয়া নান্দাইলঃ-
সমাজের বিবেক হিসেবে সাংবাদিকের দায়িত্ব কেবল সংবাদ সংগ্রহ ও প্রকাশে সীমাবদ্ধ নয়। একজন প্রকৃত সাংবাদিক সত্যের পক্ষে দাঁড়ান, মানুষের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার থাকেন এবং সমাজকে আলোর পথে এগিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করেন।
ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ এনামুল হক বাবুল সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন, যিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা, শিক্ষা বিস্তার ও সমাজসেবাকে এক সুতোয় গেঁথে মানুষের আস্থা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
১৯৬৩ সালের ৫ জানুয়ারি নান্দাইল উপজেলার গাংগাইল ইউনিয়নের পংকরহাটি গ্রামে তাঁর জন্ম। তিনি নান্দাইল রোড উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মরহুম টিআইএম আজিজুল হকের সন্তান।
শিক্ষিত ও মূল্যবোধসম্পন্ন পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠায় ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে সত্যনিষ্ঠা, জ্ঞানচর্চা এবং সমাজের জন্য কাজ করার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
তিনি নান্দাইল রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা, নান্দাইল রোড উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং নান্দাইল শহীদ স্মৃতি আদর্শ ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই লেখালেখি, সাহিত্যচর্চা ও সমাজসচেতন কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের সাংবাদিকতার ভিত তৈরি করে।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি নিভিয়াঘাটা ফাজিল মাদ্রাসায় চার বছর শিক্ষকতা করেন। পরে জনতা ব্যাংকের চট্টগ্রাম কর্পোরেট শাখায় জুনিয়র অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় চাকরির পথ ছেড়ে মানুষের পক্ষে কথা বলার অঙ্গীকারকে বেছে নিয়ে তিনি নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিবেদন করেন সাংবাদিকতায়।
সাংবাদিকতা জীবনে তিনি খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক অনির্বাণ, ময়মনসিংহের সাপ্তাহিক বাংলার দর্পণ, দৈনিক জাহান, বাংলার বাণী এবং দীর্ঘ ২৪ বছর দৈনিক যুগান্তর-এর নান্দাইল প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে তিনি দৈনিক আমাদের সময়-এর নান্দাইল প্রতিনিধি এবং GSN News 24.com-এর সম্পাদক ও প্রকাশক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর সংবাদ পরিবেশনায় বরাবরই স্থান পেয়েছে সত্য, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থ।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি সমাজসেবায়ও তিনি সমানভাবে সক্রিয়। নান্দাইল প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাকালীন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে টানা ৪০ বছরেরও বেশি সময় ১৫ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
বর্তমানে তিনি নান্দাইল প্রেসক্লাবের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য, উপজেলা হাসপাতাল স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সদস্য, বইপড়া আন্দোলন নান্দাইলের সভাপতি, বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশন নান্দাইল শাখার সাধারন সম্পাদক এবং বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছেন।
শিক্ষা বিস্তারেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি নান্দাইল রোড উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনবার নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। নতুন প্রজন্মের মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘হক ফাতেমা পাঠাগার’, যা আজও জ্ঞানচর্চার এক অনন্য কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশুশ্রম নিরসন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। নান্দাইল উপজেলার প্রথম সরকারি অনুমোদিত এনজিও এইচআর ফাউন্ডেশন-এর চেয়ারম্যান হিসেবে বিভিন্ন সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। তরুণ সাংবাদিকদের কাছে তিনি কেবল একজন সিনিয়র নন; একজন অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রেরণার উৎস।
সাংবাদিকতা জীবনের প্রথম কিংবদন্তি সাংবাদিক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া পদক পান। দীর্ঘ কর্মজীবনে সাংবাদিকতা ও সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ, ভারত ও নেপাল থেকে বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন।
২০২২ সালে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার জন্য তিনি মর্যাদাপূর্ণ ‘মহাত্মা গান্ধী গোল্ডেন অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। এ পর্যন্ত তিনি মোট ২৫টি পদক ও সম্মাননা অর্জন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি একজন সফল অভিভাবক। তাঁর একমাত্র ছেলে একজন প্রভাষক, এক মেয়ে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের চিকিৎসক এবং অপর মেয়ে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন। পরিবার, পেশা ও সমাজ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি দায়িত্বশীলতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
আজকের সময়ে যখন গণমাধ্যম নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ, বিভ্রান্তি ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি, তখন মোহাম্মদ এনামুল হক বাবুলের মতো সাংবাদিকরা মনে করিয়ে দেন সাংবাদিকতা কেবল একটি পেশা নয়; এটি সত্য, ন্যায়, মানবতা ও জনস্বার্থের প্রতি আজীবনের অঙ্গীকার। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর নিরলস পথচলা স্থানীয় সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনুকরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
জীবনের বহু অর্জন, সম্মাননা ও দায়িত্বের ঊর্ধ্বে তিনি যে পরিচয়টিকে সবচেয়ে বেশি ভালোবেসে ধারণ করেছেন, সেটি সাংবাদিক। আর সেই কারণেই বলা যায়, জীবনের সব অর্জনের ওপরে তাঁর কাছে সাংবাদিকতাই সর্বশ্রেষ্ঠ পরিচয়।