কী অসাধারণ একটা ম্যাচ! কী দুর্দান্ত লড়াই! শেষ পর্যন্ত জয় পেয়েছে আর্জেন্টিনা, কিন্তু ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয় জিতে নিয়েছে কেপ ভার্দে। মাত্র ছয় লাখ মানুষের ছোট্ট এক দ্বীপরাষ্ট্র, যার জাতীয় দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেড়ে ওঠা প্রবাসী। সেই দলই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে এমনভাবে চাপে ফেলেছিল, যেন একটু হলেই মায়ামিতে ঘটতে চলছিল বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটন।
এই ম্যাচের গল্প এক কথায় বলা কঠিন। ১২০ মিনিটজুড়ে যেন একের পর এক নাটকীয় দৃশ্য। কখনও লিওনেল মেসির জাদু, কখনও ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার অবিশ্বাস্য সব সেভ, আবার কখনও কেপ ভার্দের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। ম্যাচের গতি, আবেগ আর নাটকীয়তা এত দ্রুত বদলেছে যে শেষ বাঁশি বাজা পর্যন্ত কিছুই নিশ্চিত ছিল না।
শেষ বাঁশি বাজার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা হাঁটু গেড়ে বসে পড়েন। গ্যালারিতে তখন স্বস্তির উল্লাস। ৩-২ ব্যবধানে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা নিশ্চিত করে লিওনেল স্কালোনির দল, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ মিসর।
তবে ম্যাচ শেষের সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যটা ছিল অন্য প্রান্তে। কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা হতাশ মুখে হাঁটছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, সুযোগ পেলে আরও ৩০ মিনিট খেলতেও প্রস্তুত। বিশ্বকাপ যাত্রা শেষ হয়ে গেলেও তারা বিদায় নিয়েছে এমন এক ম্যাচ খেলে, যা অনেক দিন মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব।
ম্যাচের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি আসে অতিরিক্ত সময়ে। নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ হয়েছিল ১-১ সমতায়। মনে হচ্ছিল, ম্যাচের ভাগ্য এখনও ঝুলে আছে।
অতিরিক্ত সময় শুরু হওয়ার দুই মিনিটের মাথায় কর্নার থেকে ফিরে আসা বল বক্সের বাইরে পান লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে জোরালো শটে বল জালে পাঠিয়ে আবারও আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে দেন তিনি। স্টেডিয়ামজুড়ে তখন স্বস্তির বিস্ফোরণ। যেন সবাই ধরে নিয়েছিল, এবার আর ভুল হবে না।
কিন্তু কেপ ভার্দে হার মানার দল নয়।
গোল হজম করার পরই তারা পাল্টা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অল্প সময়ের মধ্যে আদায় করে নেয় টানা তিনটি কর্নার। এরপর ১০২তম মিনিটে আসে এমন একটি গোল, যা এবারের বিশ্বকাপের সেরাগুলোর তালিকায় সহজেই জায়গা পাবে।
বাঁ প্রান্তে বল পেয়ে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢোকেন সিডনি লোপেস কাবরাল। জায়গা তৈরি করে ডান পায়ের নিখুঁত শটে বল পাঠিয়ে দেন দূরের কোণে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজের কোনো সুযোগই ছিল না। বলটি যেন বাতাস চিরে ধীরে ধীরে জালের দিকে এগিয়ে গেল, আর মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল আর্জেন্টিনা সমর্থকে ঠাসা গ্যালারির বড় একটি অংশ।
গোল করেই দৌড়াতে শুরু করেন কাবরাল। মাঠ ছেড়ে গ্যালারির সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে কাউকে জড়িয়ে ধরে উদযাপন করেন। সম্ভবত তিনি তার প্রেমিকা ছিলেন—আর না হলেও, এমন এক মুহূর্তের পর সম্পর্কটা আরও দৃঢ় হয়ে যাওয়ারই কথা।
কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা তখন নাচছেন, একে অপরকে জড়িয়ে ধরছেন। অতিরিক্ত সময়ের তখনও ১৫ মিনিট বাকি, অথচ তাদের মধ্যে ক্লান্তির কোনো ছাপ নেই।
তবু শেষ পর্যন্ত জয়টা যায় আর্জেন্টিনারই। ১১১তম মিনিটে লিওনেল মেসির কর্নার থেকে ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেড ডিফেন্ডার দিনেই বোর্হেসের গায়ে লেগে জালে জড়িয়ে যায়।
তাতেও অবশ্য শেষ চেষ্টা ছাড়েনি কেপ ভার্দে। ১১৬তম মিনিটে এমিলিয়ানো মার্তিনেজকে দুর্দান্ত দুটি সেভ করতে বাধ্য করে তারা। কিন্তু আর সমতা ফেরানো হয়নি। শেষ বাঁশি বাজতেই আর্জেন্টিনা বেঁচে যায়, আর কেপ ভার্দে বিদায় নেয় মাথা উঁচু করেই।
এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বিশ্বসেরা ফুটবলার লিওনেল মেসির সঙ্গে কেপ ভারদের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার লড়াই।
ভোজিনিয়ার ক্যারিয়ার কখনোই খুব আলোচিত ছিল না। পর্তুগালের দ্বিতীয় বিভাগের ক্লাব শাভেসের গোলরক্ষক তিনি। ইউরোপের বড় মঞ্চে আলো ছড়ানোর সুযোগ খুব একটা পাননি। কিন্তু এই বিশ্বকাপে নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা। একের পর এক দুর্দান্ত সেভে কেপ ভার্দেকে ম্যাচে টিকিয়ে রেখেছিলেন অভিজ্ঞ এই গোলকিপার।
ম্যাচের আবহটাও ছিল দারুণ। মায়ামির বিশাল স্টেডিয়াম ম্যাচ শুরুর অনেক আগেই আকাশি-সাদা জার্সিতে ভরে যায়। চারদিকে শুধু আর্জেন্টিনার পতাকা, গান আর উৎসবের আমেজ। গত বছর ক্লাব বিশ্বকাপে বোকা জুনিয়র্সের ম্যাচেও শহরটি এমন রূপ দেখেছিল। এবারও যেন সেই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি হলো। মেসিকে একনজর দেখতে হাজারো সমর্থক গ্যালারিতে ভিড় জমিয়েছিলেন।
কোচ লিওনেল স্কালোনি পরিচিত কৌশলেই দল সাজান। মাঝমাঠে রদ্রিগো দে পল, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ও এনসো ফার্নান্দেজকে রেখে তিনজনের মিডফিল্ড গড়ে তোলেন। আক্রমণে হুলিয়ান আলভারেজের পরিবর্তে সুযোগ পান লাউতারো মার্তিনেজ।
শুরুর ১৫ মিনিট অবশ্য খুব একটা জমেনি। আর্জেন্টিনা বলের দখল ধরে রাখলেও পরিষ্কার কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেনি। সমর্থকেরা গান গেয়ে দলকে উৎসাহ দিচ্ছিলেন, কিন্তু মাঠে বড় কোনো মুহূর্ত তখনও আসেনি।
প্রথমবারের মতো গ্যালারিতে উত্তেজনা ছড়িয়ে দেন মেসি। ডিফেন্সের মাঝখানে ছোট্ট একটি ফাঁক খুঁজে বের করে নিচু শট নেন তিনি। বলটি অল্পের জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। কয়েক মিনিট পর আরেকটি সুযোগ আসে তার সামনে। ফ্রি-কিক থেকে নেওয়া শট দেয়াল পেরোলেও ভোজিনিয়া প্রস্তুত ছিলেন। সহজেই বলটি তালুবন্দি করেন তিনি।
এরপর ২৮তম মিনিটে আসে সেই মুহূর্ত, যার অপেক্ষায় ছিল পুরো স্টেডিয়াম।
মাঝমাঠ থেকে লিসান্দ্রো মার্তিনেজের নিখুঁত পাস ধরে ডিফেন্ডারদের পেছনে চলে যান মেসি। দৌড়ের মধ্যেই অসাধারণ দক্ষতায় বল নিয়ন্ত্রণে নেন তিনি। প্রথম স্পর্শেই বল এমনভাবে নিজের সামনে রাখেন, যেন গোল করার পথটা আরও সহজ হয়ে যায়।
এরপর আর ভুল করেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ভোজিনিয়া পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই জোরালো শটে বল পাঠিয়ে দেন জালের ওপরের দিকে। গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিল না। মুহূর্তেই আনন্দে ফেটে পড়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকে ঠাসা স্টেডিয়াম।
যদিও গোল হজম করার পরও ভোজিনিয়া ভেঙে পড়েননি। বরং ম্যাচের বাকি সময়ে আরও কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করে আর্জেন্টিনাকে হতাশ করেন তিনি। একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে তিনি যেন একাই লড়ছিলেন মেসি ও তার সতীর্থদের বিপক্ষে।
বিশ্বকাপজুড়ে ভোজিনিয়াও হয়ে উঠেছেন আলোচিত এক চরিত্র। ৪০ বছর বয়সে এসে এমন মঞ্চে নিজেকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ খুব কম ফুটবলারেরই আসে। টুর্নামেন্ট চলাকালেই তিনি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর সমর্থিত একটি ভিডিও গেম প্ল্যাটফর্মের প্রচারণার চুক্তিও করেছেন। ঘটনাচক্রে নকআউট পর্বে তার সামনে দাঁড়িয়েছিলেন মেসি। যেন এক অদ্ভুত মিলন—মেসি, রোনালদো আর ভোজিনিয়া; একই গল্পের তিনটি আলাদা চরিত্র। বিশ্ব ফুটবলের দুই মহাতারকার মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের নামটিও আলাদা করে লিখে ফেলেছেন কেপ ভার্দের এই অভিজ্ঞ গোলরক্ষক।
দ্বিতীয়ার্ধে যেন নতুন এক কেপ ভার্দেকে দেখা গেল। প্রথমার্ধে অনেকটা হিসেবি ফুটবল খেললেও এবার তারা আর্জেন্টিনাকে নিজেদের অর্ধে আটকে রাখতে শুরু করে। মাঝমাঠে চাপ বাড়ায়, বল হারানোর পরপরই প্রেসিং করে এবং আক্রমণে খেলোয়াড় বাড়াতে থাকে। এর সুফলও খুব দ্রুত পেয়ে যায় দলটি।
৫৩তম মিনিটে তারা প্রথমবারের মতো লক্ষ্যে শট নেয়। দীর্ঘ সময় ধরে আক্রমণ চালানোর পর বলটি বক্সের বাইরে ডেরয় দুয়ার্তের কাছে আসে। কোনো সময় নষ্ট না করে নিচু শট নেন তিনি। বলটি জোরালো হলেও এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটি আটকে দেন।
তবে সতর্কবার্তাটা বুঝতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
ছয় মিনিট পরই আসে সমতার গোল। ডান প্রান্ত থেকে রায়ান মেন্দেস দ্রুত বল বাড়িয়ে দেন দুয়ার্তের দিকে। বক্সের সামনে সামান্য জায়গা পেয়েই ডান পায়ের শক্তিশালী শটে বল পাঠিয়ে দেন দূরের কোণে। এবার আর কোনো সুযোগই পাননি এমিলিয়ানো মার্তিনেজ।
গোল হতেই উল্লাসে ফেটে পড়েন কেপ ভার্দের খেলোয়াড়রা। কর্নার ফ্ল্যাগের পাশে জড়িয়ে ধরে উদযাপন করেন সবাই। গ্যালারিতে থাকা কেপ ভার্দের অনেক সমর্থকের চোখে তখন আনন্দের অশ্রু। মুহূর্তটি ছিল শুধু একটি গোলের আনন্দ নয়, বরং ইতিহাসের দরজায় কড়া নাড়ার অনুভূতি।
ভাবুন তো, মাত্র ১৯৮৬ সালে ফিফার সদস্য হওয়া একটি দেশ। আর তাদের প্রতিপক্ষ তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, যার নেতৃত্বে আছেন লিওনেল মেসি। এমন একটি দলকে বিদায়ের মুখে ঠেলে দেওয়ার স্বপ্ন তখন আর অসম্ভব মনে হচ্ছিল না।
সমতায় ফেরার পর আর্জেন্টিনা অবশ্য বসে থাকেনি। একের পর এক আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নামান স্কালোনি। কেপ ভার্দের রক্ষণে চাপ বাড়তে থাকে। বক্সে ভেসে আসে অসংখ্য ক্রস। কিন্তু প্রতিবারই সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ভোজিনিয়া। কখনো বল মুঠোয় নিয়েছেন, কখনো ঘুষি মেরে দূরে সরিয়েছেন, আবার কখনো ঝাঁপিয়ে পড়ে নিশ্চিত গোল বাঁচিয়েছেন।
নির্ধারিত সময়ে আর কোনো দলই ব্যবধান গড়তে পারেনি। ফলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে, যেখানে অপেক্ষা করছিল আরও বড় নাটক।
তবে ফল যাই হোক, কেপ ভার্দের জন্য এটি ছিল গর্ব করার মতো একটি রাত। পুরো টুর্নামেন্টে তারা যে সাহস, শৃঙ্খলা আর লড়াইয়ের মানসিকতা দেখিয়েছে, এই ম্যাচ যেন তারই সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।
এক অর্থে কেপ ভার্দেই যেন এবারের বিশ্বকাপের প্রতিচ্ছবি। অভিবাসন, পরিচয় আর ইতিহাসের নানা স্তর মিলিয়ে গড়ে ওঠা একটি দল। মাত্র ছয় লাখ মানুষের এই দ্বীপপুঞ্জ একসময় ছিল ঔপনিবেশিক শক্তিগুলোর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। সময়ের সঙ্গে দেশটির অসংখ্য মানুষ ছড়িয়ে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্সসহ ইউরোপ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে।
আজকের জাতীয় দলটিও সেই ইতিহাসের প্রতিফলন। প্রায় পুরো স্কোয়াডই প্রবাসে বেড়ে ওঠা কিংবা বিদেশি ক্লাবের হয়ে খেলা ফুটবলারদের নিয়ে গড়া। ফুটবলই যেন তাদের জন্য ছড়িয়ে থাকা মানুষদের আবার একটি পতাকার নিচে একত্র হওয়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে।