রাবি প্রতিনিধি: এম এ আতিকুর রহমান
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে এসে কেউ টিউশনি খোঁজেন, কেউ ল্যাপটপে গ্রাফিকসের কাজ শেখেন, আবার কারও হয়তো জরুরি দরকারে একটা ব্যানার বানিয়ে নেওয়া কিংবা মেসে পার্সেল পৌঁছে দেওয়ার মতো মানুষ লাগে। কিন্তু সঠিক সময়ে কাজের উপযোগী মানুষ খুঁজে পাওয়াটা ক্যাম্পাসে চিরকালের সমস্যা। শিক্ষার্থীদের এই কাজের সুযোগ ও জরুরি চাহিদার মাঝে সেতু তৈরি করতে ‘বলয়’ নামে একটি প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও রুয়েটের দুই শিক্ষার্থী।
উদ্যোক্তা দুজন হলেন রাবির তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল (ইইই) বিভাগের জায়িফ হাসান এবং রুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের মাহিন বিন হাসান। দুজনই নটর ডেম কলেজের সহপাঠী ছিলেন।
গত ১০ সেপ্টেম্বর থেকে অনেকটা চুপিসারেই যাত্রা শুরু করে বলয়। এরপর ৭ অক্টোবর প্লে-স্টোরে অ্যাপ চালু হয়। কোনো জমকালো উদ্বোধন ছাড়া কেবল নিজেদের মধ্য সীমাবদ্ধ থাকলেও এরই মধ্যে প্রায় এক শ শিক্ষার্থী অ্যাপটিতে যুক্ত হয়েছেন। বর্তমানে রাবি ও রুয়েট ক্যাম্পাস ঘিরে অ্যাপটির প্রাথমিক কার্যক্রম চলছে।
হাঁটতে হাঁটতে পাওয়া ধারণা
উদ্যোগটির পেছনের গল্পটাও বেশ সাধারণ। রাজশাহীতে আসার পর দুই বন্ধু প্রায়ই বিকেলে বা সন্ধ্যায় একসাথে হাঁটতে বের হতেন। আড্ডায় উঠত ঢাকা আর রাজশাহীর জীবনযাত্রার তফাত, ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের নানা সীমাবদ্ধতা আর আর্থিক টানাটানির কথা। সেখান থেকেই জাওয়েফের মাথায় আসে—শিক্ষার্থীদের এই বিচ্ছিন্ন দক্ষতাগুলোকে যদি এক ছাদের নিচে আনা যেত!
পরে বিষয়টি তিনি মাহিনকে জানান। স্কুলজীবনেই কোডিংয়ে হাত পাকানো মাহিন নটর ডেম আইটি ক্লাবের রোবোটিক্স প্রধান ছিলেন। মাহিনের উদ্যোগ ViperDevs-এর হাত ধরেই নামল অ্যাপের কোড। প্রায় ছয় মাসের চিন্তাভাবনা আর চার মাসের টানা কোডিংয়ের ফল এই বলয়। বাইরের কোনো ফান্ডিং ছাড়া নিজেদের জমানো টাকা থেকেই সার্ভার ও আনুষঙ্গিক খরচ চালাচ্ছেন এই দুই তরুণ।
যেভাবে মিলবে কাজ
বলয় মূলত শিক্ষার্থীদের কাজের একটা মুক্তবাজার। ধরা যাক, কারও একটা ব্যানার ডিজাইন করা দরকার কিন্তু চেনা ডিজাইনার নেই। তিনি অ্যাপে কাজের বিবরণ ও পারিশ্রমিক লিখে পোস্ট করবেন। আগ্রহী শিক্ষার্থীরা বিড বা প্রস্তাব পাঠাবেন। যার প্রস্তাব পছন্দ হবে, তাঁকে কাজটা বুঝিয়ে দেবেন কাজদাতা। শুধু ডিজাইন নয়; টিউটরিং, ডেলিভারি বা ছোটখাটো টেকনিক্যাল কাজের জন্য অ্যাপটি ব্যবহার করা যাবে।
তবে এখানে লেনদেনের ক্ষেত্রে অ্যাপ কর্তৃপক্ষ কোনো কমিশন নেয় না। টাকা সরাসরি শিক্ষার্থীর হাত থেকে অন্য শিক্ষার্থীর হাতে যায়। বলয়ের আয় মূলত ‘টোকেন’ বিক্রি থেকে। কাজ পোস্ট করতে বা বিড করতে নির্দিষ্ট টোকেনের দরকার হয়, যা বিকাশ থেকে সেন্ড মানি করে বা বিজ্ঞাপন দেখে সংগ্রহ করতে হয়।
পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক, তবে সতর্কতা জরুরি
ভুয়া আইডি ঠেকাতে নিবন্ধনকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইডি কার্ড যাচাই করা হয়। কোনো কাজ নিয়ে ঝামেলা বা প্রতারণা হলে অ্যাপে অভিযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট আইডির টোকেন কেটে নেওয়া বা অ্যাপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে যেহেতু আর্থিক লেনদেন সম্পূর্ণ নিজেদের মধ্যে হয়, তাই অ্যাপ কর্তৃপক্ষ কোনো টাকা রিফান্ডের দায় নেয় না। ফলে কাজ নেওয়ার ক্ষেত্রে নিজেদেরই সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন আয়োজকেরা।
পরিকল্পনা দেশজুড়ে
আপাতত দুই ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও আগামী ১ নভেম্বর থেকে জোরকদমে নামার প্রস্তুতি চলছে। ক্যাম্পাসজুড়ে প্রায় ৫০০ পোস্টার লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে উদ্যোক্তাদের। আগামী ছয় মাসের মধ্যে রাবি ও রুয়েটে অ্যাপটিকে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়ে এক বছরের মধ্যে দেশের বাকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও ‘বলয়’ ছড়িয়ে দিতে চান তাঁরা।
‘Your circle has your back’—স্লোগান সামনে রেখে এগোতে থাকা এই প্ল্যাটফর্মটি বাস্তবে শিক্ষার্থীদের কতটা কাজে আসছে, তা জানতে হলে অবশ্য অফিশিয়াল উদ্বোধনের পর নিয়মিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ও লেনদেনের বাস্তব চিত্র দেখার জন্য আরও কিছুটা অপেক্ষা করতে হবে।